আ’লীগের চামড়া বিএনপির চামড়া

প্রকাশকাল- ০০:১২,অক্টোবর ৩, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

সাইফুল্লাহ হিমেল

Saifullah Himel

কটার পিটের চামড়া তুলে লেব আমরা, কটার দুই গালে জুতা মারো তালে তালে। উল্লিখিত বাক্য দুইটি পাবনার সদর উপজেলার আতাইকুলা থানাধীন পুষ্পপাড়া এলাকার আঞ্চলিক ভাষায় লেখা হয়েছে। যখন অনেক ছোট ছিলাম তখন এই স্লোগান দিয়ে মিছিল করতাম। মিছিল করতাম নিজ মহল্লার ভেতরেই। শৈশবের বন্ধুদের সাথে। না, এটা কোন রাজনৈতিক মিছিল না। নিছক খেলার ছলে।

নির্বাচন এলে এলাকার রাজনৈতিক নেতারদের মুখ থেকে শেখা স্লোগান দুটি। ‘অমুকের চামড়া, তুলে নেব আমরা। ……দালালেরা হুশিয়ার সাবধান’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন অনেক ছোট। ক্লাস টু বা থ্রিতে পড়ি। সেই সময়ে আমাদের গ্রামে একবার মুরগি চুরির ধুম পড়ে গেল। একদিন স্কুল থেকে এসে বন্ধুরা মিলে বুদ্ধি করলাম আজকের মিছিল হবে মুরগি চুরির বিরুদ্ধে। এক বন্ধু বল্ল তাহলে চোরটা কে? পাশের গ্রামের ছিল এক চোর। নাম তার ‘কটা কালাম’। সবাই তাকে কটা চোর বলেই জানত। আসলে কটা মুরগি চুরি করেছে কি করেনি? সেটা বড় কথা না। আমরা কটা ছাড়া অন্য কোন চোরকে চিনতাম না তাই কটার নামেই মিছিল করেছিলাম।

তবে মিছিলে স্লোগানের ভাষা চয়ন হয়েছিল তৎকালীন রাজনৈতিক মিছিল থেকে। অবশ্য স্লোগানের ভাষাগুলো নিজেরা আলোচনা সাপেক্ষা নির্বাচন করেছিলাম বলে মনে হয় না। নিজেদের অজান্তেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্লোগান অনুসরণ করেছিলাম। তখন কটা ছাড়া অন্য কোন চোরের নাম জানতাম না বিধায় কটার বিরুদ্ধে মিছিল করতাম। কিন্তু এখন বড় হয়েছি। অনেক চুরির কাহিনি এবং চোরের নাম পরিচয় জানি। কিন্তু তথ্য প্রমাণ হাতে থাকার পরেও চোরের বিরুদ্ধে আর মিছিল করতে পারি না। শুধু আমি না, মনে হয় পাঠক মহলের সবারই কম বেশি চুরি/চোরের বিষয়ে জানা আছে।

মাঝে মাঝে মনে হয় ছোট ছিলাম ভালই ছিলাম। এখনও যদি ছোট থাকতাম তাহলে হয়তো চোরের নাম উল্লেখ না করতে পারলেও কটার উপর দিয়ে মিছিলটা চালিয়ে দিতাম। যাই হোক আসল কথায় আসা যাক। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার বয়স চার বছর অতিক্রমের পথে। কুষ্টিয়ার পার্শবর্তী জেলায় বাড়ি এবং পরিবহণ সুবিধা থাকার কারণে অন্যান্যদের তুলনায় আমার বাসায় যাওয়া একটু বেশিই হয়। লালন সেতু থেকে কুষ্টিয়া শহরের দিকে আসতে সামান্য পথ অতিক্রম করার পর থেকেই শুরু হয় উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থানরত দেশের মহাসড়কের আসল চিত্র। কুষ্টিয়া মজমপুর হয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পর্যন্ত রাস্তা গত চার বছরে একটানা তিন/চার মাস কখনোই ভাল দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। গাড়ি চালাতে গিয়ে হিমশিম খায় চালক। গাড়ি ড্রাইভ করার সময় চালকের চেহারা দেখে এমনটিই মনে হয়েছে।

পাবনার দাশুড়িয়া বাইপাসের অবস্থা আরো খারাপ ছিল। যথা সময়ে আর সঠিক মেরামতে অভাবে পরিস্থিতি এতই নাজুক ছিল যে গাড়ি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল বাইপাসটি। সম্প্রতি রাস্তার উপর তিন/চার স্তরে মাটির ইট বিছিয়ে উন্নয়নের মহাসড়ক নির্মান করা হয়েছে। রাস্তার খানা-খন্দগুলো এখন পাথর দিয়ে মেরামত করা হয় না। দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করলেও দেশের মহাসড়কগুলো মাটির ইট/ইটের খোয় দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে। যা সামন্য আঘাতেই ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

যে রাস্তায় পরিবহণের চাপ যত বেশি রাস্তার কাজের মজবুতি ততো বেশি হওয়া আবশ্যক। রাস্তা-ঘাট মেরামতের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী কাজ বুঝে নেওয়া অপরিহার্য। কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি করে কিছু মানুষের পকেট ভারি করতে সাহায্য করা ছাড়া মহাসড়ককে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

সর্বশেষ ২ অক্টবর বাসা থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্য আসার সময় গড়াই পরিবহণে একজন মাঝ বয়সী চালকের সাথে কথা হলো। জানালেন, গাড়ি নষ্ট হওয়ায় গাড়ি চালনো নেই। তাই কুষ্টিয়ায় মালিকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আমার পাশের ছিটেই বসা। কথায় কথায় তিনি চমৎকার কিছু বাক্য উচ্চারণ করলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে যে কথা দুটি বেশি বাস্তব মনে হয়েছে তা উল্লেখ করার ইচ্ছে করছি। “‘রাস্তা-ঘাটের অবস্থা ভালো’ সেতু মন্ত্রীর এমন বক্তব্য চালকদের কাছে বিষের মতো লাগে। গাড়ির মালিকের ভোট সরকার পড়লেও গাড়ি চালকের ভোট সরকার পাবে না। কারণ ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালানোর কষ্ট মালিকের চেয়ে চালকই বেশি পেয়ে থাকে।”

কুষ্টিয়ার চৌরহাস পার হয়ে এসে বিআরবি গ্রুপের সামনে যখন গাড়ি তখন বিনা পয়সায় কিছু দোল খেয়ে নিলাম। রাস্তার গর্তগুলো এত বড় যে গাড়ির পুরো বডি একবার এদিকে আবার অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ে। বটতৈল এলাকা ছেড়ে আসার পর দেখলাম রাস্তার উপর থেকে মোটা একটি স্তর তুলে ফেলা হয়েছে। আগের সেই পুরাতন রাস্তার উপর দিয়ে চলছে গাড়ি। তবে আওয়ামী আমলে রাস্তার গায়ে লাগানো চামড়া তুলে বিএনপির আমলে লাগানো চামড়ার উপর দিয়েই গাড়ি ভালো চলছে।

লেখক
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক