উপকূলীয়াঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মৌমাছি

প্রকাশকাল- ২০:৪২,অক্টোবর ১১, ২০১৭,খুলনা বিভাগ বিভাগে

12002মহানন্দ অধিকারী মিন্টু, খুলনা প্রতিনিধি ॥

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের প্রিয় সেই ছড়া ‘কাজের লোক’
“মৌমাছি, মৌমাছি
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াও না একবার ভাই।
ওই ফুল ফোটে বনে
যাই মধু আহরণে
দাঁড়াবার সময় তো নাই।”
কবির মতো মৌমাছি বললেই অবধারিতভাবে আমাদের ভাবনায় প্রথমেই চলে আসে মধু! অথচ ছোট্ট এই পতঙ্গটি বিশ্বসংসার তথা মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত যে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে মধু তার কাছে নস্যি! অথচ অধুনিকায়নের ফলে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে মৌমাছি। দেশের দক্ষিণ উপকূলীয়াঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মৌমাছি। প্রায় ২০ প্রজাতির মৌমাছির মধ্যে ১১ টি বিলুপ্ত প্রায়। এই বিলুপ্তির পেছনে রয়েছে আধুনিক সভ্যতার বাহন মোবাইল ফোন টাওয়ার এবং কৃষি ক্ষেতে অপরিকল্পিতভাবে কীটনাশকের ব্যবহার। মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত তড়িৎ চুম্বকির তরঙ্গ শক্তি বা ইলেক্ট্র ম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের কারণে বিপর্যয়ে পড়েছে মৌমাছি। শুধু মৌমাছি নয়, বাদুরের মতো কীটপতঙ্গ এবং প্রাণীকূলও এ কারণে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে।
প্রায় ২দশক আগে দেশের দক্ষিণ উপকূলীয়াঞ্চল খুলনার পাইকগাছাসহ পাশ্বর্তী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে দেখা মিলত মৌমাছির বাসা। আজ আর তেমন দেখতে পাওয়া যায় না। অধুনিকায়নের ফলে এ অঞ্চল থেকে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে মৌমাছি। বিপর্যয়ে পড়েছে জীব বৈচিত্র এবং তাদের খাদ্য চক্র। উদ্ভিদের জীবন চক্রও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৌমাছি তার গতিপথ ঠিক রাখা এবং চলার জন্য প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ওয়েভ ব্যবহার করে। একই সঙ্গে নেভিগেটরের মাধ্যমে সূর্যকে কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে। মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত তড়িৎ চুম্বকির তরঙ্গ শক্তি বা ইলেক্ট্র ম্যাগনেটিক রেড়িয়েশনের কারণে বিভ্রান্ত হয়ে মৌমাছি এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করে। স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ গুণ বেশি শব্দ করে। ৬০ হার্টজ তরঙ্গ শক্তি মৌমাছিকে বিভ্রান্ত করে। এবং ২৫০ হার্টজ তরঙ্গ শক্তি মৌমাছিকে বিক্ষিপ্তভাবে ছোটাছুটি করতে বাধ্য করে। এই বিভ্রান্তির কারণে মৌচাক থেকে মৌমাছি বেরিয়ে বিভ্রান্ত হয়। তারা পথ হারিয়ে বিক্ষিপ্ত ভাবে ঘোরাফেরা করে। আর মৌচাকে ফিরে আসতে পারে না। এর ফলে মধুর উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। এই রেডিয়েশন পুরুষ মৌমাছির প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। তারা বন্দ্যাত্বের দিকে চলে যায়। কৃষিতে ব্যাপকভাবে বেড়েছে কীটনাশকের ব্যবহার। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের ব্যবহার করা হয়। এ কারনে মৌমাছিসহ বিভিন্ন উপকারী কীটপতঙ্গ মারা যাচ্ছে। যার কারণে পরাগায়নে সমস্যা হচ্ছে। এই সমস্যা আরো প্রকট হচ্ছে। এজন্যে কৃষকের অসচেতনতা এবং কর্পোরেট কোম্পানীর বাজারজাতকরণের কূটকৌশল দায়ী।

প্রাণীবিদদের ভাষ্যমতে, মৌমাছির মতো উপকারী কীট কমে যাওয়া বা বিলুপ্তি পরিবেশের জন্য বিরাট একটি সমস্যা। মোবাইলের ইলেক্ট্র ম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের কারণে অবশ্যই একটা ক্ষতিহয়। তবে এ বিষয়ে দেশে বিস্তারিত কোনো গবেষণা হয়নি। তবে মৌমাছির বিলুপ্তির জন্য বেপরোয়া কীটনাশক ব্যবহারও দায়ী। প্রায় ২০ প্রজাতির মৌমাছি পাওয়া যায় তার অর্ধেকই বর্তমানের বিলুপ্ত। প্রাকৃতিক মৌচাক এখন আর দেখা যায় না। এই বিলুপ্তি পরাগায়ন, বিশেষত জীববৈচিত্রের জন্য ক্ষতির কারন হিসেবে ধরা যায়।