একাত্তরের স্মৃতি চারণ -বংশিপাড়া রণাঙ্গন

প্রকাশকাল- ২১:০২,নভেম্বর ৫, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

এবাদত আলী

এদিকে বর্ষার পানি কমতে শুরু করে। পথঘাটে তখন পায়ে হেঁটেই চলাচল করা য়ায়।
মূলত আমাদের কাজ ছিলো দেশের অভ্যন্তরে যাতে রাজাকার আলবদর আল শামস মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে তার দিকে নজর রাখা। সেই সঙ্গে সুযোগ পেলে পাকিস্তানি আর্মিদের উপর আঘাত হানা বা তাদেরকে বিভিন্নভাবে কাবু করা।
কমান্ডার ওয়াসেফ আলী আমাদেরকে আটঘরিয়ার রামচন্দ্রপুর গ্রামের একটি বাড়িতে এ্কটি অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে যান।
্এরপর আমরা রামচন্দ্রপুরেই অবস্থান করছিলাম। সেখানে আটঘরিয়ার আনোয়ার হোসেন রেনুর একটি মুক্তিযোদ্ধার দলও অবস্থান করছিলো। আটঘরিয়া থানার মাজপাড়া ইউনিয়নের সোনাকান্দর ও বংশিপাড়া গ্রামের মাঝখানে বংশিপাড়া ঘাট। এই ঘাটেই ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুলাডুলি হতে ৫ কিলোমিটার পূর্ব দক্ষিণে, খিদিরপুর বাজার হতে দেড় কিলোমিটার উত্তরে চন্দ্রাবতি নদীর তীরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যে সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো তা পাবনার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। পাশের গ্রাম রামচন্দ্রপুরে মুক্তিফৌজদের একটি অস্থায়ী ঘাঁটি ছিলো। সেখানে কমান্ডার আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে মুজিব বাহিনীর একটি দল এবং ঈশ্বরদী থানার ওয়াসেফ আলী (এফ এফ ) কমান্ডারের গ্রুপও অবস্থান করছিলো। এদিন কমান্ডার ওয়াছেফ আলীর বোন মারা যাওয়ায় তিনি তার গ্রামের বাড়ি দাদাপুর চলে যান এবং টুআইসি জয়নালকে ট্রুপসের দায়িত্ব দিয়ে যান। তাই জয়নালের নেতৃত্বে একটি মুক্তিফৌজের দল তথায় অবস্থান করছিলো। আটঘরিয়া থানা পিস কমিটির দালালের নির্দেশে মোমিন রাজাকার মুক্তিফৌজদের অবস্থান সম্পর্কে পাবনায় অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীকে খবর দেয়। ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর (১৬ রমজান) উক্ত খবরের ভিত্তিতে ক্যাপ্টেন আবু তাহির খানের নেতৃত্বে প্রায় ১শ জনের একটি পাকিস্তানি সেনাদল বংশিপাড়া ঘাটে পৌঁছে। এদিকে মুক্তিফৌজদের ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রায় নব্বুইজন মুক্তিযোদ্ধা তাদের আগমণে হতচকিত হয়ে যায়। প্রথমে তারা আত্মগোপন করে স্থান ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু শত্রুকে এত কাছে পেয়ে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়ার কথা কোন যোদ্ধাই মেনে নিতে পারছিলোনা। তাই অপ্রস্তুত অবস্থার মধ্যেই তারা বীর বিক্রমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে বসে। চন্দ্রাবতি নদীর এক তীরে মুক্তিযোদ্ধা অপর তীরে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাপ্টেন তাহির খানের প্রাণহীন দেহ নদী তীরে লুটিয়ে পড়ে। কিছু সময়ের জন্য তারা হতবিহবল হয়ে পড়লেও তা সামলে নিয়ে মরিয়া হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আঘাত হানতে থা্েক। দীর্ঘ সময় একটানা যুদ্ধ করতে করতে মুক্তি যোদ্ধাগণ ক্ষুধাও পিপাসায় ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকে। তাদের সঞ্চিত গোলা বারুদেও টান পড়ে। তারা মরিয়া হয়ে লড়াই চলিয়ে যেতে থাকে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বুলেটের আঘাতে আটঘরিয়া থানার বেড়–য়ান গ্রামের আবুল কাশেম, মাজপাড়ার আব্দুল খালেক, ঈশ্বরদী থানার মুলাডুলির ইউনুছ আলী শহীদ হন। বংশিপাড়া রনাঙ্গণে আরো যারা শাহাদৎ বরণ করেন তারা হলেন, ঈশ্বরদী থানার বিভিন্ন এলাকার নায়েব আলী, আব্দুর রশিদ, আব্দুল মালেক, শহিদুল ইসলাম, মুনসুর আলী, আব্দুর রাজ্জাক, নুর মোহাম্মদ, মহসিন আলী ও আব্দুস সাত্তার।
পাকিস্তানি বাহিনী এদিন ঐ এলাকার আবুল কালাম, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারি ও নুর আলীসহ ২২জন নিরীহ গ্রামবাসিকে হত্যা করে।
এদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেনসহ প্রায় ১৬ জন সৈন্যের লাশ নিয়ে স্থান ত্যাগ করে। তারা গ্রামের মোহর আলী সেখের ঘরের দরজার একটি পাল্লা খুলে নিয়ে তার উপর ক্যাপ্টেনের লাশ দুজন গ্রামবাসিকে দিয়ে বহন করায়। পরে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। পরবর্তীকালে মুক্তিযোদ্ধারা মোমিন রাজাকার ও আটঘরিয়া থানার রাজাকার কমান্ডার কারি ইউছুফ আলীকে হত্যা করে।
বংশিপাড়ার যুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য বেড়ুয়ান গ্রামের নাকরণ করা হয় কাশেম নগর।সেখানে শহীদ আবুল কাশেম প্রগতি সংঘ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, যার মাধ্যমে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। শহীদ আব্দুল খালেকের নামানুসারে খিদিরপুর শহীদ আব্দুল খালেক উচ্চ বিদ্যালয়ের নাকরণ করা হয়। বংশিপাড়া গ্রামের আবুল কালামের নামানুসারে গ্রামের নাম রাখা হয় কালাম নগর। পরবর্তীকালে বংশিপাড়া ঘাটের পাশের এই কালাম নগরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।
বংশিপাড়া ঘাটের সম্মুখ যুদ্ধে আমরা আমাদের সহযোদ্ধাদের হারিয়ে সবাই কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ি। (লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা,সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।