এমপিও ভূক্ত শিক্ষকদের অবসর সুবিধা ঃ শুভংকরের ফাঁকি

প্রকাশকাল- ১৬:১০,জুলাই ১৮, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

– শাহীন জোয়ার্দ্দার-
শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড আর মেরুদন্ড গড়বে কারিগর শিক্ষক। সমাজের শোষক শ্রেণীর বড় অংশ এদেরকে বিভিন্ন গালভরা নামে ডাকে জাতির বিবেক, জাতির পথ নির্দেশক। যদিও সাংবাদিক সমাজকেও জাতির বিবেক, সমাজের দর্পণ নামে অভিহিত করে থাকেন। সময়ের বিবর্তনে যদিওবা সাংবাদিক সমাজ মোটামুটি একটা শক্ত ভিত্তির দেখা পেয়েছে কিন্তু শিক্ষক সমাজ একটা বিশাল জনগোষ্ঠী আজ অবধি কোন প্ল্যাটফর্ম তৈরী করতে পারেনি। যদিও তার একটাই কারন আপন স্বার্থে বৃহত্তর স্বার্থের বুকে পদাঘাত। এটিই আমলা ও রাজনীতিবিদদের অস্ত্র হানার মোক্ষম জায়গা। আমলা গোষ্ঠী সুকৌশলে শ্রেণী বিভাজনের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেণীকে হিন্দুসমাজের ব্রা‏হ্মণ শ্রেণীর কাতারে সামিল করেছে। বাকী সব অচ্ছুৎ, নি¤œ শ্রেণীর পেশাজীবি এই নি¤œ শ্রেণীর শোষনের জন্য বড় সহায় রাজনীতিবিদ। নড়বড়ে মেরুদন্ডের উপর বসে থাকা জাতির মাথা আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদগণ চিৎকার করে স্যাটেলাইট চ্যানেলে একবিংশবার ঘোষনা দেন, সরকারী শিক্ষকদের বাড়ীভাড়া ভাতা পাঁচগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। লজ্জা-শরমের মাথা কতটা খেলে একশত টাকা থেকে বাড়িয়ে বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় গলা ফাটাতে পারে। পাঁচশত টাকায় মেসের একটা সীট আদৌও পাওয়া যায় কিনা সংশয় আছে তো বটেই। বেসরকারী শিক্ষক সমাজ আলাদা একটি জাতি। সর্বোপরি নি¤œ শ্রেণির একটি জাতি বিধায় সকল শ্রেণীর চাকরিজীবিদের সারা দেশে সমরূপ চিকিৎসাভাতা প্রযোজ্য থাকলে ও এদের বেলায় তি-ন-গু-ণ কম রাখা হয়েছে। আর বেসরকারী কলেজ শিক্ষকদের মাঝে যারা অনুপাতের কালো ফাঁসের দড়িতে পড়েছে তাদের ছেলে-পুলে, নাতি-নাতনি সহকারী অধ্যাপক আর দাদা প্রভাষক। এ যেন হবুচন্দ্র রাজার দেশের গবুচন্দ্র মন্ত্রীর অপরিবর্তনীয় অদ্ভুত আইন। “অষ্টম শ্রেণী পাশ দিয়ে মোটামুটি বছর আষ্টেক এম,এল,এস,এস পদে চাকরি করিয়া ব্যাটা বংশীপদ বাইশ হাজার টাকা উপরি ব্যতীত মাইনে লইয়া প্রতি মাসে ঘরে ফেরে। জাতি গঠনের অভাগা কারিগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী লইয়াও বছর আষ্টেক পরেও এম,এল, এস,এস এর সমান হইতে পারিল না।”

মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, পনের বিশ বা ত্রিশ বছরে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে পৌঁছেছে। অনুষঙ্গ শিক্ষাকে বাজেটের সর্বোচ্চ সূচকে রাখায়। দক্ষিন এশিয়ার শ্রীলংকা, পাশ্ববর্তী দেশ ভারত যেখানে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ বেতন প্রদানে কার্পন্য করে না, তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে যাবেই। একদিন বন্ধুবর জনৈক শিক্ষক উচ্চারণ করলেন সেদিন থেকে আমাদের দেশের প্রকৃত উন্নত শুরু হবে যখন প্রতিটা অভিভাবক আফশোস করে বলবে, কেন আমার সন্তান শিক্ষক হতে পারলো না!

পারিশ্রমিক প্রসঙ্গে বললে জাতির জন্য লজ্জাষ্কর কিনা জানি না। একজন সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত দপ্তরের এম,এল,এস,এস বেতন পায় বাইশ হাজার টাকা অথচ একজন মানুষ গড়ার কারিগর পায় ষোল হাজার টাকা এর পর সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকের ভাতা মেরুদন্ডের উপর খাঁড়া মারার জন্য এক পরিপত্র জারি করা হয়েছে-অবসর ভাতার জন্য শতকরা ৬ ভাগ থেকে ১০ ভাগ প্রাপ্য বেতন স্কেল থেকে কর্তন করা হবে । বাংলাদেশে সরকারী, স্বায়ত্বশাসিত, আধা-স্বায়ত্বশাসিত কোন দপ্তরে অবসর সুবিধা দানের জন্য স্কেলের কোন অংশ নিয়মিত ভাবে কর্তন করা হয় কিনা তা জানা নেই। বর্তমানে ভূক্তভোগী অবসর প্রাপ্ত বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীরাই জানেন যে নিজেরা সারা জীবন আধাপেটা খেয়ে নিজেদের টাকা অবসর ভাতা হিসাবে তুলতে কত বছর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বারান্দায় ঘুরতে হয়। নির্মম সত্য ৭০ শতাংশই অনাহারী অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় মাটির ঘরে অবস্থান নেয়। দশ শতাংশ কর্তন সম্মন্ধে একটি সাদামাটা হিসাব বোঝাবার জন্য কোন গণিতবিদ হবার প্রয়োজন নেই। তা হলো একজন শিক্ষক বেসরকারি স্কুলে বর্তমান সময়ে বিদ্যমান নিয়মে নিয়োগ প্রাপ্তির সময় ১৬০০০ টাকা স্কেলে যোগদান করে এবং আটবছর পরে টাইম স্কেল পেয়ে ২২০০০ টাকায় দাঁড়ায়। যা সে অবসরে যাওয়া পর্যন্ত ওখানেই স্থির থাকে। প্রতিমাসে যদি উক্ত শিক্ষকের বেতন থেকে ১০ শতাংশ হারে কর্তন করা হয় তবে মাসে ১৬০০ টাকা এবং বছরে ১৯২০০ টাকা যা দ্বারা যে কোন ব্যাংকে ডিপিএস হিসাবে জমা করলে ৮ বছরে ২,০০,০০০/- টাকা সঞ্চয় দাঁড়ায়। পরবর্তী আট বছরে উক্ত সঞ্চিত টাকা দ্বিগুণ অর্থাৎ ৪,০০,০০০/- টাকাতে দাঁড়ায় ইতোমধ্যে ২২০০০/- টাকা স্কেলে ৮ বছরে ডিপিএস এর মেয়াদান্তে ৩,০০,০০০ টাকা সঞ্চিত হয়। একজন শিক্ষক গড়ে ৩২ বছর তার কর্মজীবনে ৪ টি ৮ বছরে ভাগ করে নিলে ১৬ বছর শেষে তার সঞ্চিত অর্থ বছরে দাঁড়ায় ৭,০০,০০০ টাকায় ২৪ বছর অন্তে অর্থ তৃতীয় অষ্টম বছরে ১৪,০০,০০০/- টাকা + ৩,০০,০০০ টাকা = ১৭,০০,০০০/- টাকা এবং সর্বশেষ বা ৪র্থ অষ্টম বছরে তা দাঁড়ায় ৩৪,০০,০০০ টাকা + ৩,০০,০০০ টাকা = ৩৭,০০,০০০/- টাকাতে। যা চাহিবামাত্র পাওয়া সম্ভব। এখানে উল্লেখ্য স্কেল বর্ধিত হলে আনুপাতিক হারে কর্তন এবং সঞ্চয় দুটোই বৃদ্ধি পাবে। কাজেই এক্ষেত্রে ভ্রান্তির কোন অবকাশ নেই। অথচ উল্লিখিত স্কেলে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কষ্টের উপার্জিত অর্থ সরকারের নিকট গচ্ছিত রেখে পাঁচছয় বছর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ধর্ণা দিয়ে পাবে একশত মাসের বেতন বা ২২,০০,০০০ লক্ষ টাকা। শিক্ষক বেচারা যদি বেঁচে থাকে। দপ্তরে ঘোরাঘোরির পাঁচ ছয় বছরের অর্থের অংকে পরিমাপ করলে কমপক্ষে আরও পঁচিশ লক্ষ টাকা বেড়ে ৬২,০০,০০০ টাকায় স্থির হয়। এতো গেলো তফসীলী ব্যাংকে বিনিয়োগের হিসাব। সঞ্চয় পত্রে বিনিয়োগ করলে অংশটা দাঁড়ায় দ্বিগুণেরও বেশী। মাভৈঃ, সরকার বাহাদুর সত্যিকারই বেসরকারী শিক্ষকদের বোকা বানাতে সক্ষম হয়েছে।