কৃষ্ণকলি

প্রকাশকাল- ১২:১৮,আগস্ট ২, ২০১৭,অনাবিল সাহিত্য বিভাগে

rina9

রীনা দাস

ভয়টা ওর মায়েরও ছিল।আর আগে পরপর তিনবার পাত্রপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে
কলিকে। পুরো নাম ” কৃষ্ণকলি”।আজ চতুর্থ বার পাত্রপক্ষ আসবে কলিকে দেখতে। কৃষ্ণকলির গায়ের রংটা বড্ড চাপা।তাই বাবা তাকে আদর করে কৃষ্ণকলি বলে ডাকতো।মধ্যবিত্ত বাবার সংসারে অভাব থাকলেও কৃষ্ণকলি স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেই বড় হয়েছে।কলেজ পড়ুয়া কৃষ্ণকলি আজ বাবাকে ডেকে বলেছে –“বাবা!এই শেষবার,আমি আর রং মেখে পাত্রপক্ষের সামনে বসব না।” মেয়ের চোখ – মুখের দৃঢ়তা দেখে বাবাও বুঝেছিলেন মেয়ে যা বলছে তাই করবে।
কৃষ্ণকলির জন্য ঠিক করা পাত্রটি স্থানীয় নিয়ন্ত্রিত বাজারের মৎস ব্যবসায়ী।ভালোই আয়।মেয়ে ভালো থাকবে তাই সুবোধ বাবুও(কৃষ্ণকলির বাবা) রাজি হয়েছিলেন। সময়মতো পাত্রপক্ষ দেখতে এলো কৃষ্ণকলিকে। কৃষ্ণকলির গায়ের রং চাপা হলেও মুখে যেন শান্ত বনানীর শীতল ছায়া ; খুব মিষ্টি লাগে দেখতে। সেদিনও লাল পেড়ে সবুজ তাঁতের শাড়ীতে ,খোলাচুলে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল তাকে। পাত্র মিহিরের মন্দ লাগেনি কৃষ্ণকলিকে দেখে।কিন্ত মিহিরের বাবা বিনয় বাবু পণ চেয়ে বসলেন— ৫ ভরি সোনা,মোটর বাইক আর নগদ লাখ তিনেক টাকা। নিরুপায় কৃষ্ণকলির বাবা রাজি হয়ে গেল। কিছুদিনের মধ্যেই দিনক্ষণ পাকা হয়ে গেল। খুশি বাড়ির সবাই।খুশি কৃষ্ণকলিও। কারণ সে এই পণের ব্যাপারে কিছুই জানত না।
এদিকে বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসছে কৃষ্ণকলির বাবার চিন্তা ততই বেড়ে চলেছে। কোনো উপায় না দেখে তিনি চড়া সুদে স্থানীয় মহাজনের কাছে বসত বাড়ি বন্দক দিয়ে ৮ লাখ টাকা ঋণ নেন। কৃষ্ণকলি জানত না কিছুই। একদিন হঠাৎ মাঝরাতে বাবা – মায়ের কথার আওয়াজে পাশের ঘরে শুয়ে থাকা কৃষ্ণকলির ঘুম ভেঙে গেল।সে দরজায় এসে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কী কথা হচ্ছে ভিতরে??
সে শুনতে পেল বাবা কিভাবে টাকা জোগাড় করল, সে কথা মাকে বলছে।।সব শুনে মা বললেন -“হ্যাঁ গো! শোধ দেবে কিভাবে?” বাবা বললেন –“আগে বিয়েটা তো হোক,না হয় ভিটে ছাড়া হব দুজনে।বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকব।পেশায় প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক বাবার জমা- পুঁজি বলতে এই বসত বাড়িটাই।সব শুনে কৃষ্ণকলির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। বাবা – মা এই বয়েসে যাবেন কোথায়?? এই চিন্তা তাকে দু’ চোখের পাতা এক করতে দিল না সারারাত। বরাবরই চাপা স্বভাবের কৃষ্ণকলি কাউকে কিছুই বলল না।
পরদিন সকালে ৯ টা বেজে গেছে।কৃষ্ণকলির বাবা দেখলেন রোজ সকালে উঠা মেয়ে আজ এতবেলা পর্যন্ত দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে।তিনি দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকলেন–“কৃষ্ণকলি মা আমার উঠ,বেলা অনেক হল কলেজ জাবি না।” ভিতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি খুবই ঘাবড়ে গেলেন।”সারদা”,সারদা”(কৃষ্ণ কলির মা)বলে চিৎকার করে কৃষ্ণকলির মাকে ডাকলেন। দুজন মিলে অনেকবার ডেকেও যখন
দরজা খুলল না ।মিহির বাবু পাড়ার ছেলেদের ডেকে দরজা ভাঙতে বললেন। দরজা ভাঙা হলে তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। দেখলেন সিলিং ফ্যানের সাথে বিয়ের জন্য কেনা নতুন বেনারসিতে ঝুলছে কৃষ্ণকলির নিথর হয়ে যাওয়া মৃতদেহ।।

——মালদা।