চোখের পানি আর অসহায়ত্বই শেষ ভরসা পাবনা’য় রাতে চালিত বৃদ্ধ রিক্সাওয়ালাদের

প্রকাশকাল- ১৪:১৯,আগস্ট ১২, ২০১৭,রাজশাহী বিভাগ বিভাগে

Old Rickshawala Picশফিক আল কামাল ॥ যে সময়টা পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবন কাটানোর কথা, যে সময়টা নাতী-নাতনী কাঁধে-পিঠে নিয়ে ঘোড়া ঘোড়া খেলার কথা, যে সময়টা রাতের খাবার শেষ করে পরিবারের সবাই মিলে টেলিভিশন দেখা বা একটু গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসা, সেই সুন্দর মূহুর্তটা নিয়তির নির্মম পরিহাসে হারিয়ে গেছে পাবনায় রাতের বেলায় চালানো বৃদ্ধ রিক্সাওয়ালাদের জীবন থেকে।

যে রিক্সার চালিয়ে এই বৃদ্ধ বয়সেও তারা নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছে সেটাও আবার নিজের নয় চরা সুদে কিস্তিতে কেনা। প্রতিদিন ১৫০ টাকা হারে সপ্তাহে ১,০৫০ টাকা জমা দিতে হয় রিক্সা’র মহাজনকে। সেই সাথে রয়েছে প্রতিদিন ব্যাটারী চার্জ বাবদ আরো ৫০টাকা। যার ফলে যে টাকা রিক্সা চালিয়ে আয় হয় তার সিংহভাগই চলে যায় কিস্তি পরিশোধ করতে। এ সীমিত টাকায় তাদের নিজের জীবন ধারনের জন্য দুঃস্বাধ্য হয়ে পড়ে।

বৃদ্ধ রিক্সা চালকদের ছেলেরা অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে না পাড়ায় ভাল কর্ম পায় নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের ছেলেরা দিন মজুর ও বাজারের দোকনে কর্ম করে থাকে। ছেলেদের এসব কর্ম থেকে যে আয় হয় তাতে তাদের নিজের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার চলে না। আবার রিক্সা চালকদের মেয়েদের ক্ষেত্রে দেখা যায় বাবা রিক্সা চালক হওয়ার কারণে তাদের ভাল ঘরে বা সুপাত্রে বিয়ে হয়নি। তাদের সংসারে নুন (লবণ) আনতে পান্তা ফুরায়। এই কারণে ছেলে-মেয়েদের পক্ষে বাবা-মাকে দেখভাল করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। এমন হৃদয় বিদারক ও করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে পাবনায় রাতের বেলায় চালানো বেশ কিছু বৃদ্ধ রিক্সাওয়াদের সাথে কথা বলে।

পাবনা সদর উপজেলার হাজির হাট এলাকার বাসিন্দা মৃত- এরশাদ আলী মুন্সির ছেলে মো. রফিকুল ইসলাম (১১০) তিনি বৃদ্ধ বয়সে দীর্ঘ ৭০বছর যাবৎ রিক্সা চালিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছেন। পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত ৬ কাঠা জায়গা ছিল যা ৩কাঠা মাদ্রাসা ও ৩ কাঠা রোড’র জায়গার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। দরিদ্র হলেও উদার মনের অধিকারী এর বিনিময়ে কোন প্রকার অর্থ গ্রহন করেন নি তিনি। তিনি ২ ছেলে ও ৬ মেয়ের জনক। পাবনা রাধানগর এলকার লেপু সিপাহী রোডে তার ছোট মেয়ের বাড়িতে বসবাস করেন। সরকারি বয়স্ক ভাতা পান প্রতি ৩মাসে ৫০০টাকা করে মোট ১,৫০০টাকা। প্রতিমাসে রাতভর রিক্সা চালিয়ে খরচ বাদে তার গড়ে আয় হয় ৩,৭০০ টাকা থেকে ৪,০০০ টাকা পর্যন্ত। বৃদ্ধ বয়সে রোগ ব্যাধি তো নিত্য দিনের সঙ্গী। এ সীমিত টাকায় রফিকুলের জীবন চালানো কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে।

পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের আশুতোষপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত ওসমান গণির ছেলে মো. সিদ্দিকুর রহামন (৬২)। তিনি রিক্সা চালান ৩৮ বছর যাবৎ। সরকারের বয়স্ক ভাতা পান না। প্রতি মাসে রাতভর রিক্সা চালিয়ে খরচ বাদে আয় করেন ৪,০০০ টাকা থেকে ৪২০০ টাকা। তার ছেলে নেই শুধু দুইটা মেয়ে। অভাব অনটনের কারণে ভাল ঘরে বিয়ে দিতে পারে নি। প্রতি সপ্তাহে রিক্সার কিস্তি দিতে হয়। অনেক সময় মেয়েদেরকেও কিছু সাহায্য করতে হয় জামাইদের খুশি রাখতে। তার সীমিত আয়ে বিপাকে আছেন সিদ্দিক।

পাবনা শহরের কাচারী পাড়া মহল্লার বাসিন্দা মৃত-আফছার আলী মোল্লার ছেলে আক্কাস শেখ (৬১)। প্রায় ৩৬ বছর যাবৎ রাতের বেলায় রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। সরকারের বয়স্ক ভাতা পান না। তার ২ ছেলে দোকানে কাজ করে তাদেরই সংসার ঠিক মতো চলে না বাবাকে কিভাবে দেখাশোনা করবে। এ বৃদ্ধ বয়সে প্রতিমাসে রাতভর রিক্সা চালিয়ে খরচ বাদে তার গড়ে আয় হয় ৪,৩০০ টাকা থেকে ৪,৫০০ টাকা পর্যন্ত। প্রতি সপ্তাহে রিক্সার তাকেও কিস্তি দিতে হয়। সীমিত আয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে মহা সংকটে আছেন আক্কাস।

পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের চর সাধুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত- নবাব আলী প্রাং ছেলে ইশারত আলী প্রাং (৬০) । তিনি সরকারি বয়স্ক ভাতা পান না। রিক্সা চালান প্রায় ৩৭ বছর যাবৎ। এ বৃদ্ধ বয়সে প্রতিমাসে রাতভর রিক্সা চালিয়ে খরচ বাদে তার গড়ে আয় হয় ৪,৫০০ টাকা থেকে ৪,৮০০ টাকা পর্যন্ত। তার ১ ছেলে ও ১ মেয়ে। অর্থাভাবে ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা করতে না পারায় ভাল কর্ম করতে না পেয়ে বেকার হয়ে ঘরে বসে। মাঝে মাঝে ঠিকা কাজ করে সীমিত কিছু টাকা আয় করে। তাতে তাদের হাত খরচের টাকাই ঠিকমতো হয় না। তাছাড়া নিজস্ব ঘর-বাড়ি না থাকায় অন্যের বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকায় আয়ের সিংহভাগ বাড়ি ভাড়ায় চলে যায়। ইশারতও কষ্টে পড়েছেন সীমিত আয় আর বাড়ি ভাড়া নিয়ে।

শুধু ইশারত, আক্কাস, আফছার ও রফিকুল নয় তাদের মতো অনেক বৃদ্ধ রিক্সা ওয়ালা আছেন যারা অল্প উর্পাজনে পরিবার-পরিজন নিয়ে গভীর সংকটে আছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসহায়ত্ব আর নিভৃতে নিরবে চোখের পানি ঝরানো যাদের চলার পথে একমাত্র ভরসা।

তাই সমাজের বিত্তবান ও সরকারের উর্ব্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রত্যাশা একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিলে এই বৃদ্ধ রাতের রিক্সা চালকেরা শেষ জীনবটা একটু স্বত্তিতে কাটাতে পারত। সেই সাথে তাদের সহজ শর্তে কিস্তি পরিশোধ এবং কিস্তি শেষে রিক্সা নিজের মালিকানা’র ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।