তানোরে কৃষি জমির ধান কেটে হিমাগার নির্মাণের উদ্বোধন

প্রকাশকাল- ২০:৪৯,এপ্রিল ২১, ২০১৭,রাজশাহী বিভাগ বিভাগে

himaরাজশাহী থেকে নাজিম হাসান
জমিগুলোতে ছিল আলু। সেটা উত্তোলন করে রোপন করা হয়েছিল বোরো ধান। সেই কচি থোড় সবুজ ধান গাছ কেটে রাজশাহীর তানোরে চারফসলি কৃষি জমিতে হিমাগার নির্মাণের উদ্বোধন করা হয়েছে। পৌর সদর তানোর গ্রামের পশ্চিমে তানোর টু মুন্ডুমালা রাস্তার আড়াদিঘী মোড়ের পূর্বদিকে জমির ধান কেটে হিমাগার নির্মাণের জন্য উদ্বোধন করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকেই কাটতে শুরু করা হয় ধান গাছ। একাধিকে চলে কচি সবুজ ধান গাছ কাটা। অন্যদিকে চলে নির্মাণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে দেদারসে একের পর এক চারফসলি কৃষি জমি নষ্ট করে হচ্ছে হিমাগার। এতে করে ধানের ভান্ডার হিসাবে খ্যাত তানোর উপজেলায় দেখা দিতে পারে ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি বলে আশঙ্খা করছেন কৃষকরা। জানা গেছে, রাজশাহীর বিশিষ্ট শিল্পপতি রহমান গ্রুপের নির্মাণ করা হবে আলুর হিমাগার। এজন্যে আগে থেকেই জমি কেনা শুরু করেন রহমান গ্রুপ। কিছু জমি আগে কেনার জন্যে আলু উত্তোলনের পর পড়ে রয়েছে ফাঁকা। পরে গত সপ্তাহের দিকে বাঁকি জমি ক্রয় করেন রহমান গ্রুপ। ক্রয়ের পর ওইসব জমিতে রোপন করা ছিল বোরো ধান। শুক্রবার সকাল থেকে সেই ধান গাছগুলো কাটা শুরু হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায় আশপাশ গ্রামের অন্তত ২৫-৩০ জন শ্রমিক সবুজ ধানের কচি থোড় পাতাগুলো কাটছেন। কেটে বস্তায় ভরে গরুর খাদ্য হিসাবে নিয়ে আসছেন বাড়িতে। কথা হয় সেখানেই বেশকিছু কৃষকের সাথে। তারা জানান, অনেক কষ্ট করে বোরো চাষাবাদ করা হয়। কারণ এ চাষাবাদে পানি সহ যাবতীয় সবকিছুই কিনতে হয়। এজন্যে বোরো রোপনের সময় অনেক টাকা খরচ হয় কৃষকের। উত্তরবঙ্গের ধানের ভান্ডার হিসাবে খ্যাত তানোর উপজেলা। যেখানে তিল পরিমাণ কৃষি জমি নষ্ট করে কোন ধরনের শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা যাবে না। এমন কঠোর হুসিয়ারী রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু আইন রয়েছে আইনের জায়গায়। কোন ধরনের শ্রেণি পরিবর্তন না করে একের পর এক হিমাগার নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে তানোরে। পৌর সদর তানোর গ্রাম ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন পার হয়ে রহমান গ্রুপ প্রায় চারফসলি ১৫ বিঘা জমির উপর হিমাগার নির্মাণ করবেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও একই স্থানে রাস্তার দক্ষিণে গভীর নলকূপ সংলগ্ন চারফসলি কৃষি জমিতে আমান গ্রুপের আনোয়ারা হিমাগার নির্মাণের জন্যে শুক্রবার উদ্বোধন করা হয় এবং কাজও শুরু হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে উত্তর অঞ্চলে যেভাবে কৃষি জমির উপর নির্মাণ করা হচ্ছে শিল্প কলকারখানা। এভাবে নির্মিত হতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষি জমি পাওয়ায় দুরহ ব্যাপার। দেখা দিবে দেশে ভয়াবহ খাদ্য ঘাটতি। রহমান গ্রুপ গত বছরে উপজেলার তালন্দ ইউপি এলাকার দেবীপুর মোড়ের পশ্চিমে চারফসলি কৃষি জমিতে নির্মাণ করেছেন রহমান কোল্ড স্টোরেজ। নির্মাণের শেষের দিকে রাস্তার উপরে নির্মাণ সামগ্রী বালি, সিমেন্ট, ইট রাখার জন্যে বালিতে স্লিপ করে মটর সাইকেল থেকে রাস্তায় পড়ে যায় উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মাকসুদা বেগম। গত জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে ঘটে এ ভয়াবহ সড়ক দূর্ঘটনা। রাস্তায় পড়ে যাওয়ার পর শিক্ষা অফিসারের শরীরের উপর দিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাক চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। নির্মাণ সামগ্রী রাস্তায় রাখার অপরাধে ওই সময় ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে রহমান স্টোরের ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। এপর্যন্তই শেষ হয়ে যায় ঘটনাটি। আলু উত্তোলনের মৌসুমে হিমাগারটির জমকালো শুভ উদ্বোধন সাংসদ ফারুক চৌধুরী। সেই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবার সময় সাংসদ রহমান গ্রুপকে বেশি বেশি হিমাগার তৈরির পরামর্শ দেন। এলাকার কৃষকদের দাবি একজন সাংসদ যখন এমন নির্দেশনা দেন তাহলে চারফসলি আর পাঁচফসলি জমি হোক হিমাগার তো হবেই। সরকারের যতই নির্দেশনা থাকুক না কেন স্থানীয় ভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জোরালো পদক্ষেপ না নিলে একের পর এক কৃষি জমি কমতেই থাকবে। তানোরের ধান দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার খাদ্যের চাহিদা মেটে। এমনকি ধানের খড় সারা বছর তানোর থেকে বিভিন্ন এলাকায় যায় গো-খাদ্য হিসাবে। জমি নষ্ট হলে ব্যাপক হুমকিতে পড়বে কৃষকরা। এনিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে কৃষি জমিতে শ্রেণি পরিবর্তন না করে হিমাগার নির্মাণ করা যায় কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, শ্রেণি পরিবর্তন হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। অনুসন্ধানে জানা যায়, কোন ধরনের জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করেই দেদারসে জমির ধান কেটে হিমাগার নির্মাণের উদ্বোধন করা হয়েছে। রহমান গ্রুপ ও আমান গ্রুপের একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে বিষয়টি জানা গেছে। এব্যাপারে জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী আশরাফ উদ্দীন জানান, কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন ছাড়া কোন ধরনের শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা যাবে না।