নাটোর-৪ আসনে আওয়ামীলীগ-বিএনপিতে নতুন মুখের ছড়াছড়ি

প্রকাশকাল- ১৯:১১,অক্টোবর ১৭, ২০১৭,চলনবিলের সংবাদ, নির্বাচন, স্লাইডশো বিভাগে

NATORE 4 Election pic-17.10.17মো. আখলাকুজ্জামান, গুরুদাসপুর (নাটোর):
নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানা কৌশলে মাঠে নেমে পড়েছেন। জনগণের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা। বিলবোর্ড, পোষ্টারিং, ব্যানার, মোবাইলে ম্যাসেজ ও ফেসবুকের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন দুই উপজেলার প্রায় কুড়িজন মনোনয়ন প্রত্যাশী। এছাড়া কুলখানি ও বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমেও ভোটারদের সাথে চলছে কৌশলী গণসংযোগ। এবার নাটোর-৪ আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে পুরাতন একাধিক প্রার্থীর পাশাপাশি নতুন মুখের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে।
দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী বর্তমান সংসদ সদস্য নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস। তার অবর্তমানে যেন তার পরিবারের কেউ এই আসন থেকে মনোনয়ন পান সেজন্য এখনই প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন তার মেয়ে কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি। এ ক্ষেত্রে বাবা-মেয়ের বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবেন বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী এবং গুরুদাসপুর পৌরসভার মেয়র শাহনেওয়াজ আলী মোল্লা। এছাড়াও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রতন সাহা, প্রয়াত এমপি রফিক সরকারের ছেলে জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের আহবায়ক অ্যাডভোকেট আরিফ উদ্দিন সরকার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আহাম্মদ আলী মোল্লা ও কৃষকলীগ নেতা জেলা মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার নাটোর জেলা সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াহাব। এসব মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বিভিন্ন সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে যোগাযোগ করে চলেছেন।
অপরদিকে বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোঃ মোজাম্মেল হক এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তবে তার মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি দলের দু:সময়ে সব আন্দোলন সংগ্রামে জোর তৎপরতা চালানো নেতা গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল আজিজ। গুরুদাসপুরের বিএনপি নেতাকর্মীরা বলেছেন, দলের দুঃসময়ে যখন বিএনপি নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ ও পুলিশের হামলা-মামলার শিকার হয়েছে তখন একমাত্র আব্দুল আজিজ চেয়ারম্যানরই তাদের পাশে ছিলেন, তাই আগামী নির্বাচনে তিনিই মনোনয়ন পাওয়ার প্রকৃত হকদার। তাছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার আগে টানা ২০বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপালন করায় উপজেলার প্রায় জনসাধারনের সাথে তার রয়েছে গভীর সর্ম্পক। ফলে তাকে প্রার্থী করলেই বিএনপির বিজয় সহজ হবে।
আসনটির দুটি উপজেলার মধ্যে বড়াইগ্রাম উপজেলায় ভোটার সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এবার বড়াইগ্রাম থেকে একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। এর মধ্যে বড়াইগ্রাম উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ইসাহাক আলী যিনি পর পর দুই বার প্রথমে বড়াইগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পরে দুইবার বড়াইগ্রাম পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় দুই উপজেলাতেই তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। সে কারণে তার সমর্থকেরা এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে তাকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জন গমেজ, বড়াইগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি জেলা আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল কাদের মিয়া, সন্ত্রাসী হামলায় নিহত বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লা নুর বাবুর সহধর্মিণী মহুয়া নুর কচি নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি জনসাধারণের সাথে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোজাম্মেল হক গত ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের সরকারের সময় থেকে রয়েছেন একেবারে নিস্কিয়। দলেও এখন তার কোন পদ নেই। মাঝে মাঝে দেশের বাহিরে থাকলেও বেশির ভাগ তার সময় কাটে ঢাকার একাধিক বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। রাজনীতিতে আসার আগেই এনজিও ব্যক্তিত্ব হিসেবে নাটোর-৪ আসনের দুটি উপজেলাতেই তিনি নিজের নামে গড়ে তুলেছেন বেশ কয়েকটি স্কুল কলেজ। সংসদ সদস্য হওয়ার পরও উন্নয়ন কাজ করেছেন। হঠাৎ গত ১১ বছর থেকে নেতাকর্মীও এলাকা ছাড়া রয়েছেন। নিজের অনুসারীদের নিয়ে দু একটি ইফতার মাহফিল করা ছাড়া এর মধ্যে তার কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি। তাছাড়া দলের জেলা বা উপজেলা নেতৃবৃন্দের সাথেও তার তেমন কোন সুসর্ম্পক নেই বলেই প্রচারনা রয়েছে। এরই মধ্যে মারা গেছেন ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর সংসদ সদস্য ও বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ একরামুল আলম। বিগত নির্বাচন গুলোতে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইতেন সাবেক এই দুই সংসদ সদস্য। এবার একজন মৃত অন্যজন রয়েছেন একেবারেই আলোচনার বাহিরে। ফলে এ আসনে বিএনপির এবার কে দলীয় প্রার্থী হতে পারেন তা নিয়ে সর্ব মহলেই রয়েছে জোরালো আলোচনা। দলের কিছু নেতাকর্মী তাই মনে করেন স্থানীয়ভাবে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন না করা গেলে প্রার্থী হতে পারেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠণিক সম্পাদক সাবেক মন্ত্রী ও নাটোর জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন দলের জেলা সাধারন সম্পাদক নাটোর চেম্বার অব কর্মাসের সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মোঃ আমিনুল হক নিজেও। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবুল কাশেম সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি নানা কর্মকান্ডের মাধ্যমে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দুবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সাধারন মানুষের সাথে তার ভাল আচরনের বিষয়টি এখনো দুই উপজেলার মানুষের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে নাটোর জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারী বর্তমানে সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন খান ২০ দলীয় জোট বা জামায়াতের দলীয় প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলের নিবন্ধন নিয়ে জটিলতার কারনে প্রয়োজনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে হলেও তার নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে। নাটোর জেলার মধ্যে এই আসনে জামায়াতের দলীয় অবস্থান ভাল থাকায় তিনিও ভাল ভাবেই নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন থেকে তিনি বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুরে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন সভা সমাবেশসহ গণ সংযোগ করে যাচ্ছেন। এছাড়া জাসদের জেলা সাধারণ সম্পাদক ডিএম আলম নির্বাচন করার লক্ষ্যে গণসংযোগ করছেন।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, নাটোর-৪ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসের সাথে রয়েছে বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের বিরোধ। দুই উপজেলা আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতৃবৃন্দের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। এমনকি দুটি উপজেলাতেই অভ্যন্তরীন দ্বন্ধের কারণে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গুরুদাসপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও গুরুদাসপুর পৌর মেয়র শাহনেওয়াজ আলী মোল্লা অভিযোগ করেন, দলীয় বিরোধের জের ধরে এমপি কুদ্দুসের নির্দেশে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায় ও লাঠিপেটা করে। এ ঘটনায় মেয়র সহ কয়েকজন দলীয় কর্মি আহত হন। শুধু তাই নয় শাহনেওয়াজ মোল্লা ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে মামলা। সে মামলায় তাকে আটক করে পুলিশ জেলেও পাঠিয়েছিল। তিনি বলেন, এমপি আব্দুল কুদ্দুস দুই উপজেলার সকল স্কুল ও কলেজে তাঁর আত্মীয় স্বজনকে সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। দলীয় ত্যাগী নেতা কর্মিদের মূল্যায়ন করা হয়নি। এসব নানা কারণে উপজেলা আওয়ামীলীগ ও এর সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে গুরুদাসপুর এলাকায় বার বার অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছে। মেয়র শাহনেওয়াজ আরো অভিযোগ করেন, এমপি কুদ্দুস দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে অন্য একজনকে গুরুদাসপুর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে সমর্থন দিয়ে সেই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় উপজেলা চেয়ারম্যান পদে বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করে।
বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা: সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী অভিযোগ করেন, সম্প্রতি বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ উপ-নির্বাচনে দল তাকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিলেও স্থানীয় এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক কুদ্দুস তার বিরুদ্ধে এবং বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। এমনকি যারা তার নির্বাচনে দলের পক্ষে কাজ করেছেন তাদের নানাভাবে হয়রানী করাসহ মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে আব্দুল কুদ্দুস সমর্থকদের হামলায় বড়াইগ্রাম এলাকায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাসহ কমপক্ষে ৫০ জন কর্মি আহত হয়েছেন। বর্তমানে নৌকার পক্ষে কাজ করার অপরাধে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মিদের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
নাটোর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক কুদ্দুস এমপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিয়োগ বাণিজ্য একটি মুখরোচক অভিযোগ। এ ধরণের অভিযোগ শুধু মিথ্যা তাই নয়, এগুলো রুচিহীন এবং ষড়যন্ত্রমুলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, এ আসন থেকে আমি চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। এলাকার লোকজন ভালবাসে বলেই আমাকে বার বার নির্বাচিত করেছেন। যে যাই বলুক আগামী দিনেও তিনিই দলের মনোনয়ন পাবেন এবং বিজয়ের বিষয়েও তিনি শতভাগ আশাবাদী। তিনি এলাকার দুটি ডিগ্রী কলেজ ও একটি হাইস্কুল সরকারি করাসহ স্কুল, কলেজ, রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ, কালভার্টসহ নানামুখী উন্নয়নের মাধ্যমে পশ্চাদপদ গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম এলাকার প্রভূত উন্নয়ন করেছেন। তিনি চেষ্টা করেছেন সকল শ্রেণির মানুষকে সাথে নিয়েই উন্নয়নসহ দলীয় আদর্শ বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু দলের মধ্যে সুবিধাবাদী কিছু মানুষ বরাবরই বিরোধিতা করে তাই এখনও করছে।