পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মঞ্জুরা রহমান অবশেষে ওএসডি

প্রকাশকাল- ২০:৪৯,অক্টোবর ২১, ২০১৭,রাজশাহী বিভাগ বিভাগে

Monzura২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের বির্তকিত সহকারী পরিচালক ডা. মঞ্জুরা রহমানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্বে অবহেলা এবং নিজ অফিসে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়া এমনকি মাদক গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ সব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বিকেলে এক চিঠিতে তাকে মহাপরিচালকের দফতরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। তার স্থলে টাঙ্গাইল ম্যাটসের অধ্যক্ষ ডা. মাহমুদ হাসানকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এদিকে ডা. মঞ্জুরা রহমানকে ওএসডি করা নিয়ে পাবনার সর্বত্র আলোচনার ঝড় বইছে। তার উশৃংখলতার কারণে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের চেইন অব কমান্ড পরম ভাবে ভেঙে পড়ে। হাসপাতালে সাধারণ রোগী তো দুরের কথা খোদ জেলা প্রশাসকও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হন। বিষয়টি নিয়ে সারা দেশসহ মন্ত্রনালয়ে হৈ চৈ পড়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পাবনার একটি সুবিধাবাদী মহলের কৃপায় ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক পদে নিযুক্ত হন বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ড্যাবের নেতা ডা. মঞ্জুরা রহমান। এর আগে ডা. মঞ্জুরা রহমান পাবনার ফরিদপুর উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় সরাসির ড্যাবের প্যানেল থেকে বিএমএ নির্বাচন করে পরাজিত হন।
সুত্র জানায়, পাবনা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক পদে অধিষ্টিত হয়ে তিনি স্থানীয় একটি মহলকে হাত করে বিভিন্ন কাজ করতে থাকেন। ঐ মহলের সঙ্গে যোগসাজশ করে ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের এমএসআর (ঔষুধ), লিলেন, যন্ত্রপাতি ক্রয়, পথ্য সরবরাহ বিভিন্ন দরপত্রে ব্যাপক অনিয়ম করে বিপুল টাকা ঘুষ নিয়ে পর পর দুই বছর চার কোটি করে দুই বছরে ৮ কোটি টাকার কাজ একই ব্যক্তিকে প্রদান করেন। এ ছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা সর্বকালের সর্বনি¤œ পর্যায়ে চলে আসে। ভেঙে পরে সকল চেইন অব কমান্ড। হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা সহকারী পরিচালককে কোন পাত্তাই দিতেন না বলে জানা যায়। সকাল ৮ থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত হাসপাতালের ডিউটি থাকলেও ডাক্তাররা রোগী না দেখে তার কক্ষে গিয়ে খোশ গল্প করতেন। অনেক ডাক্তার হাসপাতালের অভ্যন্তরে রোগী না দেখে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের সময় দিতেন। এ সব অভিযোগ নিয়ে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মঞ্জুরা রহমানের কাছে একাধিক বার অভিযোগ করা হলেও তিনি কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বরং অভিযুক্ত চিকিৎসকের পক্ষেই অবস্থান নেন। সর্বপরি অবস্থা এমন এক পর্যায় দাড়ায় যে বিশৃংখলতার শেষ পর্যায়ে চলে আসে। সুত্র জানায়, ডা. মঞ্জুরা রহমান এতই বেপরোয়া ছিলেন যে তিনি কোন নিয়ম শৃংখলার তোয়াক্কা না করে নিজের কক্ষেই ফেনসিডিল পান করতেন। কয়েক বছর আগে তিনি অন্তত ৩০টি ঘুমের বড়ি খেয়ে আতœহত্যার চেষ্টা করেন। পরে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে তাকে একটানা ১৫দিন চিকিৎসা প্রদান করা হয়। একাধিক বিয়ে এবং তার পারিবারিক জীবন নিয়ে অনেক মূখরোচক কথা ছিল পাবনার মানুষের মুখে মুখে।
পাবনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: শাফিউল ইসলাম বলেন, “গত বুধবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে পাবনার জেলা প্রশাসক রেখা রানী বালো তার বাংলোয় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় একজন ম্যাজিষ্ট্রেট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মঞ্জুরা রহমানের কাছে ফোন করে একজন চিকিৎসককে ডিসির বাংলোয় পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। জবাবে কর্কশ ভাষায় মঞ্জুরা রহমান বলেন, এখন কোন চিকিৎসক নেই। ডিসি সাহেবকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলে তিনি ফোন রেখে দেন। এ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি”। পরে পাবনার সিভিল সার্জন ডা. তাহাজ্জেল হোসেনের কাছে ফোন করা হলে সিভিল সার্জন পাবনা সিভিল সার্জন তার অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. মনিরুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে ডিসির বাংলোয় যান এবং পরীক্ষা নীরীক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেন। এ বিষয়টিসহ অন্যান্য সব অভিযোগ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের গোচরে আসলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তারা তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় বৃহস্পতিবার বিকেলে এক চিঠিতে ডা. মঞ্জুরা রহমানকে মহাপরিচালকের দফতরে ওএসডি হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজ করেন। তার স্থলে টাঙ্গাইল ম্যাটসের অধ্যক্ষ ডা. মাহমুদ হাসানকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক হিসেবে বদলী করা হয়।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. তাহাজ্জেল হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বার্তা সংস্থা পিপ‘কে বলেন, আমার কাছে কোন ডাক্তার নেই। আমি প্রশাসনিক বিষয় দেখি। তার পরেও ডিসি সাহেবের অসুস্থতার কথা শোনার পরপরই আমার মেডিকেল অফিসার মনিরুজ্জামানকে নিয়ে তার বাংলোয় যাই এবং চিকিৎসা দেই।
পাবনার জেলা প্রশাসক রেখা রানী বালো বলেন, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রথমে আমার অফিসাররা হাসপাতালের সহকারী পরিচালককের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তার কোন রেসপন্স না পেয়ে সিভিল সার্জন সাহেবেকে তারা ফোন করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বার্তা সংস্থা পিপ‘কে বলেন, ‘খোদ ডিসি সাহেবের চিকিৎসা দিতে যদি এই অবস্থা হয়, তা হলে সাধারণ মানুষ কি চিকিৎসা পাবে ?।
এ ব্যাপারে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের ওএসডি হওয়ায় সহকারী পরিচালক ডা. মঞ্জুরা রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “গত বুধবার ল্যান্ড ফোনে কোন এক ব্যক্তি ডিসির বাসায় একজন মেডিসিনের ডাক্তার পাঠানোর জন্য বলেন। কিন্তু সেই সময় মেডিসিনের কোন চিকিৎসক ঐ সময় না থাকায় ডাক্তার পাঠানো সম্ভব হয়নি। আমি ফোনদাতাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ডিসি সাহেবকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলে তিনি ফোন রেখে দেন। ডা. মঞ্জুরা আরও বলেন, পাবনা জেনারেল হাসপাতালে জেলা জজ থেকে শুরু করে অনেক বড় অফিসার চিকিৎসা নিয়েছেন। আর এখানে সকল যন্ত্রপাতি আছে। তাই ডিসি সাহেব আসলে এখানে আরও ভাল চিকিৎসা পেতেন। তিনি আরও বলেন, চাকুরি করলে ওএসডি হওয়া কোন ব্যাপার না। যেখানে পোষ্টিং দিবে সেখানেই চাকুরি করবো।