বাগমারায় মা-ছেলে খুনের মামলার তদন্ত কার্যক্রম তিন বছরেও শেষ হয়নি

প্রকাশকাল- ২১:০৯,সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭,রাজশাহী বিভাগ বিভাগে

নাজিম হাসান,রাজশাহী প্রতিনিধি:

রাজশাহীর বাগমারায় চাঞ্চল্যকর মা ও ছেলে হত্যাকান্ডে দায়ের করা মামলার তদন্ত কার্যক্রম তিন বছরেও শেষ হয়নি। দফায় দফায় মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও তদন্তের কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আজো অভিযোগপত্র দিতে পারেনি পুলিশ। প্রায় তিন বছর আগে এ হত্যাকান্ড ঘটে। এরপর পাঁচবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদলেছে। শেষ পর্যন্ত এই জোড়া হত্যাকান্ডটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে এটি বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে গেলে গ্রেফতার করা হয় সন্দেহভাজন পাঁচ ব্যক্তিকে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা আদালতে আ’লীগের নেতা আবুল হোসেন ওরফে আবুল মাষ্টারকে এ জোড়া হত্যাকান্ডের মূল হোতা হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। অথচ হত্যাকারীদের মূলহোতা শনাক্ত হওয়ার পরেও রহস্যজনক কারণে সে গ্রেফতার না হওয়ায় নিহতের পরিবার বিচার নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থের জোদানদাতাকে এলাকায় প্রকাশ্যে দেখা গেলেও গ্রেফতার করা হচ্ছেনা। এলাকা সুত্রে জানাগেছে,উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের দেউলা গ্রামের ভবানীগঞ্জ বাস ষ্ট্যান্ড মোড়ে ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর দিবাগত রাতে মা আকলিমা বেগম (৪৫) ও ছেলে জাহিদুল ইসলাম (২৫) নিজ ঘরে খুন হন। দু’জনকেই গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরের দিন সকালে মা-ছেলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিনই নিহত আকলিমা বেগমের বড় ছেলে দুলাল হোসেন বাদী হয়ে বাগামার থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকেই চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের তদন্ত নানা নাটকীয়তার মোড় নেয়। মামলার বাদী ও এলাকার লোকজনের অভিযোগ, পুলিশ প্রকৃত খুনিদের গ্রেফতার না করে দেউলা গ্রামের সান্টু নামে এক মানসিক প্রতিবন্ধীকে এবং বাসুপাড়া ইউনিয়নের এক বিএনপি’র নেতা কলেজ শিক্ষক এনামুল হককে সম্প্রতি গ্রেফতার করে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের এ ধরনের কাজে নিহত পরিবারের সদস্য ও এলাকার সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তদন্ত কর্মকর্তা। এদিকে চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকের এ পর্যন্ত পাঁচ দফা পরিবর্তন করা হয়েছে। এরপর তিন বছর অতিবাহিত হলেও খুনের তদন্ত আজো শেষ করতে পারিনি পুলিশ। তদন্তের কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আজো অভিযোগপত্র দিতে পারিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা। পুলিশ এই জোড়া খুনের ঘটনায় আসামিদের সাথে গোপনে বাণিজ্য শুরু করেছে অথবা রাজনৈতিক কারণে পুলিশ প্রকৃত আসামিদের আড়াল করার চেষ্টা করছে নাকি অন্য কোনো গডফাদার পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়ছে। এ নিয়ে এলাকাবাসির মনে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জণ সৃষ্টি হয়েছে। তবে, ২০১৫ সালের শেষের দিকে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই) রাজশাহী বিভাগে স্থানান্তর করা হলে তখন থেকেই মামলাটির তদন্তের অনেকটা অগ্রগতি হয় এবং হত্যাকান্ডের মূল হোতাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিহত আকলিমা বেগমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের নম্বর ট্যাকিংয়ের মাধ্যমে পাশের দূর্গাপুর উপজেলা থেকে পাঁচজনকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছে থেকে নিহত জাহিদুলের মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। গ্রেফতার হওয়া আসামিদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল্লাহ আল কাফি ও মনিরুল ইসলাম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে তারা খুনের ঘটনায় নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জানায়, ঘটনার রাতে নিহত আকলিমা বেগমের দেবর বাগমারা উপজেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দেউলা রানী রিভারভিউ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন ওরফে আবুল মাষ্টার তাদের ভাড়া করে নিয়ে আসে। ওই রাতেই আবুল মাষ্টার ও রফিক তাদের আকলিমার ঘরে ঢুকিয়ে নেন। পরে তারা দুই দলে ভাগ হয়ে আকলিমার ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় আকলিমার ও পাশের ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় ছেলে জাহিদুলের হাত, পা ও মুখ বেঁধে গলা কেটে হত্যা করে। ওই রাতেই হত্যাকান্ডের জন্য তাদের নগদ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করে ওই তিন হত্যাকারি। এদিকে হত্যাকান্ডের মূল হোতা আবুল হোসেনের নাম পরিষ্কার হওয়ার পর গত বছর শেষের দিকে পুলিশ তাকে গ্রেফতারের জন্য দেউলা গ্রামে তার বাড়িতে অভিযান চালায়। সে সময় আবুল বাড়িতে অবস্থান করলেও পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এখন পর্যন্ত তিনি পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশের দাবি। তবে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থের জোগানদাতা আবুল হোসেন পলাতক থাকলেও চাকরি থেকে নিয়মিত বেতন ভাতা উত্তোলন করছেন। শুধু তাই না, তার হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরও হচ্ছে নিয়মিত। অনেকেই অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত আবুল হোসেনকে প্রায় সময়ই এলাকায় দেখা যায়। অথচ রহস্যজনক কারণে পুলিশ এখনো তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এ বিষয়ে বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাছিম আহম্মেদ বলেন, মামলাটি যেহেতু পিবিআইয়ের হাতে স্থানান্তর করা হয়েছে কাজেই আসামি গ্রেফতারের দায়িত্বও তাদের। মামলার তদন্তকারী কর্তকর্তা পিবিআই রাজশাহীর পরিদর্শক আলমগীর হোসেন বলেন, পঞ্চমবারের মত তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়ে মাত্র ৩/৪ মাস আগে মামলাটি আমার কাছে এসেছে। স্পর্শকাতর এ মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং খুব শিগগিরই আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তবে আসামি গ্রেফতারের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।