ভূমিমন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

প্রকাশকাল- ০৮:৫৭,ডিসেম্বর ১৪, ২০১৭,রাজশাহী বিভাগ বিভাগে

Tomal Photoভূমিমন্ত্রীর ছেলে ঈশ্বরদী উপজেলা যুবলীগ সভাপতি শিরহান শরীফ তমালের বিরুদ্ধে এলাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী বানিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ উঠেছে। তার হাত থেকে দলীয় নেতাকর্মী, সাংবাদিক এমনকি তার দুলাভাইও রেহাই পাননি। চার সাংবাদিককে মারধরের মামলায় বুধবার (১৩ ডিসেম্বর) তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে জামাই-শ্বশুরের দ্বন্দ্বের বিষয়টিও সামনে এসেছে। পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ মিন্টু ভূমিমন্ত্রীর জামাতা। তিনি ঈশ্বরদী পৌরসভার মেয়রও। আগামী সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া উপজেলা) আসন থেকে দলীয় মনোনয়নের বিষয়টিও আলোচনাও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়েই মূলত জামাই-শ্বশুরের দ্বন্দ্ব। ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর জামাতা মিন্টু চান শ্বশুরের জায়গায় স্থান পেতে। অন্যদিকে মিন্টুর স্ত্রী ভূমিমন্ত্রীর মেয়ে মেহজাবিন শিরিন পিয়াও নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার পক্ষে রয়েছেন স্ত্রী কামরুন্নাহার শরীফ, মেয়ে জেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহজাবিন শিরিন পিয়া, ছেলে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি শিরহান শরীফ তমাল ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব সরকার, ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান মিন্টু, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মন্ত্রীর এপিএস বশির আহমেদ বকুল। অন্যদিকে জামাই পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঈশ্বরদীর পৌর মেয়র আবুল কামাল আজাদ মিন্টুর পক্ষে রয়েছেন ঈশ্বরদী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বিশ্বাস, শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা রশিদুল্লা, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি যুবায়ের বিশ্বাস, উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সালাম খানসহ স্থানীয় ঠিকাদারদের বড় একটি অংশ।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৮ মে দুপুরে শিরহান শরীফ তমাল ও উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক রাজিব সরকারের নেতৃত্বে ঈশ্বরদী পৌর সদরের বাজারে ভূমিমন্ত্রীর জামাতা আবুল কালাম আজাদের মিষ্টির দোকান লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডার ভাঙচুর করা হয়। এ সময় ফুড জংশন নামের একটি দোকানেও ভাঙচুর করা হয়। এরপর শহরের কলেজ রোডে মুক্তিযোদ্ধা আজমল হক বিশ্বাসের ছেলে যুবলীগের সাবেক নেতা আরিফুল হাসান বিশ্বাস ও উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের বিশ্বাসের শহীদ আমিনপাড়ার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।

এ ঘটনায় ঈশ্বরদী পৌর সদরের কলেজ রোড মহল্লার আজমল হক বিশ্বাস ও মুক্তিযোদ্ধা আতিয়ার রহমান বিশ্বাস বাদী হয়ে ১৯ মে দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর যৌথ অভিযান চালিয়ে মন্ত্রীর ছেলে শরীফ তমালসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। ১৩ জুন জামিনে বের হয়ে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

গত ২৯ নভেম্বর ঈশ্বরদীর রূপপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ভূমিমন্ত্রীর ছেলে শিরহান শরীফ তমাল ও ক্যাডার বাহিনী পিটিয়ে আহত করে চার সাংবাদিককে। এ ঘটনায় ঈশ্বরদী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও ভূমিমন্ত্রীর ছেলে শিরহান শরীফ তমাল ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব সরকারের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাত ২৫-৩০ জনকে আসামি করে ডিবিসির জেলা প্রতিনিধি পার্থ হাসান বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় মামলা (নম্বর-৭০,২৯/১১/২০১৭) দায়ের করেন।

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন জানান, ১১ ডিসেম্বর রাতে ঈশ্বরদীতে যুবলীগ নেতা আলমগীর হোসেনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগও রয়েছে তমাল বাহিনীর বিরুদ্ধে।

সাংবাদিকের দায়ের করা মামলায় বুধবার (১৩ ডিসেম্বর) আদালতে জামিন নিতে পাবনার পিপি আক্তারুজ্জামানের (ঢাকা মেট্র-গ-১১-০২৯৮) গাড়িতে করে আদালতে আসেন শিরহান শরীফ তমাল। এ সময় বেপরোয়া গতির গাড়িটিকে পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। গাড়িটি পুলিশকে চাপা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তমালের বহনকারী গাড়ির ধাক্কায় এ সময় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই আবু সাঈদ ও কনস্টেবল জাহাঙ্গীর হোসেন।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এর আগে আদালত চত্বরে ১৭টি মাইক্রোবাসযোগে তমাল সমর্থকরা এসে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় আদালত চত্বরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।আদালত এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

ভূমিমন্ত্রীর জামাতা ঈশ্বরদী পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ মিন্টু বলেন,‘ভূমিমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে তার ছেলে তমালের নেতৃত্বে মাদকসেবী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের প্রতিনিয়ত হামলা ও নির্যাতন করে আসছে। এর আগে ভূমিমন্ত্রীর ছেলে তমালের নেতৃত্বে আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ, মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। এই ঘটনায় জেল খাটার পরও তাদের বাহিনীর দাপট কমেনি। তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণেই আলমগীরকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়েছে।’

সময় টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি এস এ আসাদ জানান, আমাদের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ পৃথক অভিযান চালিয়ে ৮ জনকে গ্রেফতার করে। কিন্তু তারা আবার জামিনে বের হয়ে গেছে। তবে আজ মূল আসামির জামিন নামঞ্জুর হয়েছে। আদালতের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। আশা করি আমরা বিচার পাবো।

এটিএন নিউজের জেলা প্রতিনিধি রিজভী জয় জানান, সাংবাদিক পেটানোর মামলার মূল আসামির আদালতে হাজিরা দেওয়াকে কেন্দ্র করে তমাল বাহিনীর সমাগমে আদালত চত্বরে বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ সময় সাংবাদিকরা ছবি তুলতে গেলে হুমকি দিয়ে বাধা দেওয়া হয়।

সাংবাদিক পেটানো মামলার বাদী ডিবিসির জেলা প্রতিনিধি পার্থ হাসান জানান, আজ বুধবার দুপুরে পাবনার সাংবাদিকদের আয়োজনে ভূমিমন্ত্রীর ছেলে তমালের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ শেষে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। দোষীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।