মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের দিন গুলো

প্রকাশকাল- ২১:৫৯,অক্টোবর ২৯, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

– এবাদত আলী
(পুর্ব প্রকাশের পর)

পাবনার তৎকালিন জেলা প্রশাসক মোঃ মাহবুবুর রহমানের উদ্যোগে পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের জন্য সাংবাদিক ও কলামিস্ট রনেশ মৈত্রকে সঙ্গে নিয়ে ডিসি পুলের একটি জিপে করে আমরা সেদিন মাধপুর গিয়ে পৌঁছলাম।
পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের মাধপুরে যে সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো তার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শি মাধপুর গ্রামের ইজ্জত আলী। ইজ্জত আলীর বয়স আশির কোঠায়। আমরা মাধপুরের যুদ্ধের বিষয় বলতেই তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল্লেন চলেন জাগায় যাই। তার বসতভিটা থেকে সামান্য দুরে একটি প্রকান্ড বটগাছ। ১৯৭১ সালের ২৯ র্মাচ এই বট গাছের নিচেই সংঘটিত হয়েছিলো ভয়াবহ যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ। ইজ্জত আলী সন তারিখ জানেন না। শুধু জানেন গোলা-গুলির কথা। তিনি বটগাছের নিচে গিয়েই বলেন, এই খানে বড়াম বড়াম করে গুলি হয়। মেলেটারিরা গুলি করে খই ফুটার মতন। আর কিছু ছাওয়াল পল আসে ইশিদ্দি (ইশ্বরদী) থেকে। উয়েরে কাছে ইরা কিচুই লায় বাবা। আমি কইকি তাও তো তারা বাধা দিছিলো। আমরা তন্ময় হয়ে ইজ্জত আলীর কথা শুনছিলাম। জিপ গাড়ি দেখে সেখানে অনেক লোক-জন জড়ো হয়। সকলেই যুদ্ধের কাহিনী বলতে চায়। কথা বলার যেন পাল্লা লেগে যায়। এক জন আরেকজনের উপর দিয়ে কথা বলে। প্রত্যক্ষদর্শিদের সকলের কথা একসঙ্গে করে যা দাঁড়ায় এবং পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের বিবরণী হতে যে বর্ণনা সংগ্রহ করা হয় তাতে পাবনা শহরের পশ্চিমে কাশিপুর শিল্পনগরি ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণকারি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে স্বেচ্ছাসেবি যোদ্ধাগণ প্রায় চারদিক থেকে অবরোধ করে রাখে। পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরুপায় হয়ে তাদের নিরাপত্তার অভাবের কথা জানিয়ে ২৮ মার্চ-১৯৭১ তারিখে ঢাকা আর্মি হেডকোয়ার্টারে জরুরি ওয়ারলেস ম্যাসেজ পাঠায়। পরদিন সকালে রাজশাহী বিভাগীয় শহরে অবস্থানরত পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক কর্ণেল বালুক এর নির্দেশে টুআইসি মেজর রাজা আসলাম কিছু অফিসার ও বিপুল সংখ্যক সেনা সদস্য নিয়ে পাবনায় আটকেপড়া সৈন্যদের উদ্ধার করে রাজশাহী নিয়ে যাবার জন্য রওনা হয়। রাজশাহী থেকে মুলাডুলি-দাশুড়িয়া- দাদপুর ও মাধপুর হয়ে পাবনা শহরের কাশিপুর শিল্পনগরিতে পৌঁছে। এসময় পাবনা শহর ও শহরতলি এলাকায় বিমান থেকে অতর্কিতে বিক্ষিপ্তভাবে মেশিনগানের গলি বর্ষণ শুরু করে। বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণের ফলে ক্ষণিকের জন্য হলেও মুক্তিকামি স্বেচ্ছাসেবি যোদ্ধাদের মাঝে ভীতির ভাব পরিলক্ষিত হয়। বলতে গেলে তারা স্থান ত্যাগ করে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেয়। এই সুযোগে বিমান হামলার ছত্রছায়ায় প্রায় ১শ ৮০জন পাকিস্তানি সৈন্য পাবনা-পাকশী কাঁচা সড়ক ধরে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে পালাতে থাকে।
এদিন ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ পাকিস্তানি আর্মির এই গ্রুপটি প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পাবনা শহরের পশ্চিমে কাশিপুর শিল্প এলাকা থেকে পালিয়ে ১১ খানা মিলিটারি ট্রাক ও কয়েক খানা জিপ যোগে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারূদসহ চর এলাকা দিয়ে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে পশ্চিম দিকে রওনা হয়। এই সৈন্য দলটি হিমায়েতপুর হয়ে চর এলাকা দিয়ে সোজা মাধপুর হয়ে দাশুড়িয়া ও মুলাডুলি দিয়ে রাজশাহীর দিকে পালিয়ে যাবার জন্য রওনা হয়। তারা পাবনা- পাকশী সড়কে না গিয়ে চরের মধ্য দিয়ে রওনা হবার ফলে চরের বালু মাটিতে অনেক স্থানে গাড়ির চাকা আটকে যায়। এতে অনেক সময় লেগে যায়।
পাকিস্তানি সৈন্যদের এই ভাবে পালিয়ে যাবার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে ঈশ্বরদী থানা সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দসহ একদল তরুন সাহসি সেচ্ছাসেবি যোদ্ধা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য অগ্রসর হয়।
তারা পাবনা সদর থানার মাধপুর গ্রামে পৌঁছেই দেখতে পায় যে, দুরে চর এলাকা দিয়ে আর্মির গাড়ি বহর আসছে। তখন তারা শত্রু হননে মেতে উঠে এবং মাধপুর গ্রামের দক্ষিনে ‘মাধপুর কোলের’ তীরে অবস্থিত একটি প্রকান্ড বটগাছের আড়ালে ও পার্শ¦বর্তী ঝোপ-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে।
অপর দিকে ঈশ্বরদী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে গঠিত সর্বদলীয় সংগাম কমিটির অসংখ্য নেতা কর্মি দাশুড়িয়া-তেঁতুলতলা, বাঁশেরবাদা, আওতাপাড়া, ছলিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালি ব্যারিকেড তৈরি করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে আক্রমণ করার জন্য পজেশন নেয়। এ দিকে পাবনা শহর হতে যখন পাকিস্তানি সেনাবহর রওনা হয় তখনই তাদের পিছু নেয় পাবনা শহর ও আশেপাশের বহুসংখ্যক মুক্তিকামী যোদ্ধা। তারা সুযোগ খুজতে থাকে কিভাবে তাদের উপর আক্রমণ চালানো যায়। পাবনা শহর হতে ৬ মাইল পশ্চিমে দাপুনিয়া ইউনিয়নের মাধপুর গ্রামের দক্ষিনে যখন আর্মিদের কনভয় আসতে থাকে তখন মাধপুর বটগাছের আশে পাশে এবং বিভিন্ন জায়গায় ওৎ পেতে থাকা যোদ্ধাগণ পাকিস্তানি আর্মিদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করে বসে। অতর্কিতে আক্রমণের ফলে পাকিস্তানি বাহিনী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আত্মরক্ষার জন্য গুলি ছুড়তে থাকে। মুক্তিকামি যেদ্ধাগণের হাতের অস্ত্রও একসঙ্গে গর্জে ওঠে। শুরু হয় উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল লড়াই।
পাকিস্তানি বাহিনী কিছুটা পিছু হটে গিয়ে ভারি অস্ত্র দিয়ে মুক্তিকামি যোদ্ধাদের উপর আঘাত হানতে থাকে। বৃষ্টির মত গুলি ছুড়তে থাকলে গ্রামবাসীরা যে যেখানে পারে প্রাণভয়ে পালাতে থাকে। শিশু-কিশোর,ও নারী-পুরুষের আর্তচিৎকারে এবং প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দে মাধপুর এলাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। মাধপুর গ্রামটি একটি রণাঙ্গনে পরিণত হয়। ‘কোল’ এর পাড়ের প্রকান্ড বটগাছের শিকড়ের মাঝখানে, গাছের আড়ালে ও আশেপাশের ঝোপ-জঙ্গলে এবং পাশ্ববর্তী বাঁশঝাড়ে লুকিয়ে থেকে মুক্তিকামি যোদ্ধাগণ থেমে থেমে গুলি ছুঁড়তে থাকে। জবাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মরনাস্ত্র থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি বের হতে থাকে।
এক সময় পাকশী-রুপপুর গ্রামের তরুন সাহসি যোদ্ধা, ঈশ্বরদী জিন্নাহ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি হাবিবুর রহমান রাজু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে বটগাছের শিকড়ের মাঝে লুটিয়ে পড়েন। সেই সাথে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য মাধপুর রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে নুরুল ইসলাম নুরু, আব্দুর রাজ্জাক, আলী আহম্মদ, আব্দুল গফুর, সাহাপুর গ্রামের ওহিদুর রহমান, ঈশ্বরদীর বাঘঈল গ্রামের নওয়াব আলী সহ আতাউল হক আতু, আব্দুস সবুর এবং আরো প্রায় ৫০জন মুক্তিকামী যোদ্ধা শহীদ হন। শহীদদের তাজা রক্তে সেখানকার মাটি ভিজে লাল হয়ে ওঠে।
কাকুল মিলিটারী একাডেমি হতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সমর কৌশলের কাছে টিকে উঠতে না পেরে অন্যান্য যোদ্ধগণ আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়।
মাধপুরের এই ভয়াবহ যুদ্ধে বেশ কিছু সংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য নিহত ও আহত হয়। এ সময় গোটা এলাকা জুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বীভৎস তান্ডব লীলা শুরু করে। তারা মাধপুর গ্রামের বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এলোপাথারিভাবে গুলি ছুঁড়ে বেশ কিছু নিরীহ লোকজনকে আহত করে। তারা নির্মমভাবে এই গ্রামের কানু মোল্লাকে হত্যা করে। হত্যা করে আছেরের পুত্র জামালকে। একই গ্রামের মহিউদ্দিন (পুলিশ), জাকের, আরমানের পুত্র হামের উদ্দিন এবং ফরমান সরদারকে নিষ্ঠুরভাবে তারা হত্যা করে।
এরপর পলায়নরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিহত ও আহত সৈন্যদেরকে নিয়ে গাড়ি বহর যোগে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। (চলবে)। (লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)