মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের দিন গুলো

প্রকাশকাল- ২২:১৫,নভেম্বর ১২, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

এবাদত আলী (৩)
(পুর্ব প্রকাশের পর)

পাবনার তৎকালিন জেলা প্রশাসক মোঃ মাহবুবুর রহমানের উদ্যোগে পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের জন্য সাংবাদিক ও কলামিস্ট রনেশ মৈত্রকে সঙ্গে নিয়ে ডিসি পুলের একটি জিপে করে আমরা মাধপুর গিয়ে পৌঁছলাম।
ঈশ্বরদী থানার দাশুড়িয়ার যুদ্ধ। ১৯৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পাবনা সদর থানার দাপুনিয়া ইউনিয়নের মাধপুর বটতলার যুদ্ধে অনেক পাকিস্তানি সৈন্য হতাহত হয়। লাশসহ আহত সৈন্যদেরকে ট্রাকে উঠিয়ে তারা কাঁচা রাস্তা ধরে দাদপুরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এদিকে আগে থেকেই ইশ্বরদী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে ঈশ্বরদীতে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। এর আহবায়ক ছিলেন ঈশ্বরদী সাড়া মাড়োয়ারি হাইস্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষক মোঃ ইসহাক আলী। সদস্য ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ, নুরুল ইসলাম ফকির,শামসুর রহমান শরিফ ডিলু, নাসিম উদ্দিন মন্ডল, মোঃ লুতফর রহমান, আবুল হালিম চৌধুরি, মাহবুব আহমেদ খান, তোজাম আলী, আজিম উদ্দিন, নায়েব আলী বিশ্বাস, ডাঃ আব্দুর রশিদ, মাহমুদুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম মন্টু, আবুল কাশেম বিশ্বাস, আকমল হোসেন, মোর্শারফ হোসেন চৌধুরি, আমজাদ হোসেন মন্ডল, আব্দুস সাত্তার, রবিউল আলম মাস্টার,শামসুদ্দিন আহমেদ ও মজিবুর রহমান (ভবঘুরে)।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঈশ্বরদীতে যে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছিলো তার তার কন্ট্রোল রুম ছিলো সাড়া মাড়োয়ারি হাইস্কুলের একটি কক্ষে। পরে ফায়ার সার্ভিস অফিসে কন্ট্রোল রুম স্থানান্তর করা হয়। অপরদিকে ঈশ্বরদী রেলওয়ে শহর পাকশীতে ইউছুফ আলী চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে এবং শামসুর রহমান শরিফ ডিলু, মাস্টার তোফাজ্জল হোসেন, আব্দুল গফুর, সিরাজ উদ্দিন, চাঁদ আলী মন্ডল, আজিমুদ্দিন, ডাঃ আব্দুর রশিদ, আকমল হোসেন ও ইসমাইল হোসেনকে সদস্য করে আরেকটি সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। এই সকল কমিটির মাধ্যমেই পাবনা সদরের মাধপুর বটতলা এবং ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। মাধপুরের যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি বাহিনী রাস্তার দুপাশের বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে দিতে দিতে কাঁচা রাস্তা ধরে দাদপুরের দিকে অগ্রসর হয়। আগে থেকেই সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ স্থানীয় জনগণের সহায়তায় দাশুড়িয়া এলাকায় পাবনা-ঈশ্বরদী ও পাবনা- রাজশাহী পাকা সড়কে বড় বড় গাছের গুড়ি, বালু ভর্তি ড্রাম, গরু-মহিষের গাড়ি দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। কিছু ইপি আর এবং সিরাজুল ইসলাম মনটুসহ অকুতোভয় স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধাগণ অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গায় পজেশন নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে নিশিচহ্ন করার জন্য এ্যাম্বুশ পেতে রাখে। বিপুল সংখ্যক জনগণ জয় বাংলা ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। ঠিক এরই মাঝে পলায়নপর পাকিস্তানি সৈন্যরা মাধপুর থেকে দাদপুর হয়ে দাশুড়িয়ায় পাকা রাস্তায় এসে পৌঁছানো মাত্র স্বেচ্ছাসেবি বাহিনীর এ্যাম্বুশের মধ্যে পড়ে যায়। স্বেচ্ছাসেবিদের ককটেল নিক্ষেপের ফলে তাদের একটি ট্রাকে আগুন ধরে যায়।স্বেচ্ছাসেবি যোদ্ধাদেরকে কাবু করার জন্য তারা মর্টার থেকে শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। মর্টারের শেল পাকা সড়কের উত্তর পাশে জফির উদ্দিন মালিথার (জফি মালিথা) দালানে আঘাত হানে।কিন্তু মুক্তিকামি যোদ্ধাগণ কিছুতেই পিছু হটতে রাজি নয়। তারা পাকিস্তানি সেনাদেরকে খতম করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জন্য এ যুদ্ধ ছিলো সম্পুর্ণ অপরিকল্পিত। অপরিচিত রাস্তাঘাট হওয়ায় তারা পালাবার পথ খঁজে না পেয়ে মরিয়া হয়ে গুলি চালাতে চালাতে সামনের দিকে এগুতে থাকে। এমনি অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় গোলা গুলির কারনে পাকিস্তানি আর্মির একটি জিপ গাড়ির পেট্রোল টাঙ্কি ছিদ্র হয়ে তাতে আগুন ধরে যায়। মুহুর্তের মধ্যে কালো ধুয়ার কুন্ডুুলি আকাশ ছেয়ে যায়। পাকিস্তানি আর্মিরা ভিত সন্ত্রস্ত হয়ে একসময় আত্মরক্ষা মুলক পদ্ধতি গ্রহণ করে তাদের কনভয় এবং গোলা-বারূদ নিয়ে পালাতে থাকে।
এ ঘটনায় মুক্তিকামি যোদ্ধাগণের মনে দ্বিগুন সাহস সঞ্চার হয় এবং আশে পাশের সমবেত জনতা বিজয় নিশ্চিত জেনে জয় বাংলা , জয় বাংলা বলে ধ্বনি দিতে থাকে। এসময় একটি ফাইটার বিমান তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে এবং বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ করতে থাকে।এই যুদ্ধে রূপপুরের মহিউদ্দিন পা হারান। এতে মুক্তিকামি স্বেচ্ছাসেবি বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরুপায় হয়ে ভারি মেশিনগানের গুলি ছুড়তে ছুড়তে মাড়মি-সুলতানপুরের কাঁচা রাস্তা ধরে সামনের দিকে এগুতে থাকে। তারা দরগা বাজারে দিয়ে একটি খালের মধ্যে পড়ে যায়। তারা তৎক্ষনাত খালটি ভরাট করে আবার রওনা হয়।কিন্তু রাতের বেলা তারা কোনভাবেই পালাবার পথ খুঁজে পায়না। তারা খুব ক্ষুধার্থ ও উ™£ান্ত ছিলো। তারা একসময় চন্ডিপুর নামক একটি গ্রামে পৌঁছে। সেখানে নজরুল ইসলাম নামক এক ব্যক্তি তাদের সামনে পড়ে গেলে তারা তাঁর কাছে পানি পানের জন্য অনুরোধ করে। নজরুল ইসলাম কুয়া থেকে পানি উঠিয়ে তাদেরকে পান করায়। পাকিস্তানি আর্মিরা তাকে বলে তোম লোগ বহুত সাচ্চা আদমি হায়। নজরুল তাদের ট্রাক বহরের কাছে এগিয়ে ট্রাকে অনেক মৃত দেহ দেখতে পায় এবং আহত সৈন্যদের গোঙানির শব্দ শুনতে পায়। তাদের পানি খাওয়া শেষ হলে তারা সোজা মুলাডুলির পথে রওনা হয়।
তারা রাত প্রায় ১০ টার দিকে মুলাডুলি পৌঁছলে সেখানে মুক্তিকামি যোদ্ধাদের প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়। সেখানে খন্ড যুদ্ধ হলে তারা একেবারেই বিধ্বস্থ হয়ে যায়। পরদিন সকাল বেলা দেখা যায় একজন আর্মি অফিসার দলছুট অবস্থায় একটি আখের ক্ষেতের মধ্যে শুয়ে আছে। জনতা তাকে ঘিরে ফেলে। তাকে মুলাডুলি হাচের উপরের বটগাছে ঝুলিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মুলাডুলির যুদ্ধের পর পাকিস্তানি আর্মিরা নাটোর জেলার ওয়ালিয়া গ্রামে পৌঁছলে আবার তারা মুমিÍকামি যোদ্ধাদের এ্যামুশের মধ্যে পড়ে। কথিত আছে তাদের কমান্ডার জের রাজা আসলাম সেসময় বোরকা পরে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে সে জনতার হাতে ধরা পড়ে। জনতা তাকে বহু কষ্ট দিয়ে দিয়ে হত্যা করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যরা পালিয়ে একসময় ময়না গ্রামে পেছলে সেখানেও প্রতিরোধ যুদ্ধের সম্মুখিন হয় ও তারা মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করে। সেখানে মুক্তিকামি যোদ্ধাদের মধ্যে ২২ জন যোদ্ধা শহীদ হন। পাবনা শহরের কাশিপুর শিল্প নগরি আর্মি ক্যাম্প হতে যে প্রায় ১শ৮০জন সৈন্য রাজশাহীর পথে রওনা হয়েছিলো তাদের মধ্যে মাত্র ১৮ জন সৈন্য রাজশাহী ব্যারাকে ফিরতে পেরেছিল। বাদ বাকি সৈন্যরা মাধপুর, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি, ওয়ালিয়া ও ময়নাগ্রামের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সুচনালগ্নে মুক্তিকামি যোদ্ধাদের এমন বীরত্বগাথা ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় আজো জ্বল জ্বল করছে। (চলবে)।
(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।