মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের দিন গুলো (৪)

প্রকাশকাল- ১৯:১৩,নভেম্বর ১৯, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

এবাদত আলী
(পুর্ব প্রকাশের পর)। দাশুড়িয়া তেঁতুলতলা মুক্তিকামি সেচ্ছাসেবি যোদ্ধাদের সঙ্গে পলায়নরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল দাশুড়িয়া কোরমান মিয়ার বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে। বাজার সংলগ্ন দক্ষিনে নদীর পাড়ে অতর্কিতে হামলা করে দাশুড়িয়ার তজিমুদ্দিনের পুত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসি ক্লাসের ছাত্র আইনুল হক, নওদাপাড়া গ্রামের ইসমাইল সরদারের পুত্র পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বিএ অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র আব্দুর রহমান সরদার, দাশুড়িয়ার আব্দুর রব ও দক্ষিণারঞ্জন সাহাকে গুলি করে হত্যা করে। মুনশিদপুর ও দাশুড়িয়া গ্রাম এলাকার নারী-পুরুষ জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাদের ঘর-বাড়ি ফেলে পার্শ্ববর্তী নওদাপাড়া ও অন্যান্য গ্রামে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালিয়ে, লোকজনকে পাইকারিভাবে হত্যা করে এবং বুল ড্রেজার দিয়ে রাস্তার ব্যারিকেড সরিয়ে তারা সামনের দিকে এগুতে থাকে।

দাশুড়িয়ার প্রতিরোধ যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সৈন্যরা দিশেহারা হয়ে দু দলে বিভক্ত হয়ে সামনের দিকে এগুতে থাকে। একটি দল মুলাডুলি হয়ে রাজশাহীর দিকে এবং আরেকটি দল ঈশ্রদী রেলওয়ে জংশন শহর এলাকা অতিক্রম করে রাজশাহীর দিকে যাবার জন্য ঈশ্বরদী গিয়ে পৌঁছে। ১১ এপ্রিল ঈশ্বরদী শহরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি সেনারা রেল গেটে আব্দুল মজিদ নামে এক কুলিকে গুলি করে হত্যা করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঈশ্বরদীতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরদীতে স্থায়ীভাবে বসবাসরত প্রায় ১৫ হাজার অবাঙালি বিহারি আনন্দ- উল্লাসে মেতে ওঠে। ঐসকল বিহারি নারী-পুরুষ মাথায় সাদা কাপড় বেঁধে দলে দলে মিছিল বের করে।

জঙ্গি মিছিল করে ছোরা, কিরিচ, দা, রামদা, ভুজালি,বটি, তরবারি, খাঁড়া, বল্লম, বর্শা ও টেঁটা হতে তারা পাকিস্তান জিন্দা হায়- জিন্দা রোহেগা, বিহারি আওর পাক সেনা দোস্ত হোতা হায়, মালাউন কো খতম করদো, হিন্দুস্তানকো খতম করে, পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে দিতে স্থানীয় হিন্দু ও মুসলমান বাঙালিদের বসত বাটিতে ও দোকান-পাটে একযোগে হামলা করে। বিশেষ করে নতুন বাজার, নুর মহল্লা, ফতেহমোহাম্মদপুর এলাকায় গণহত্যা ও ব্যাপকভাবে লুট-তরাজ করে এবং অগ্নিকান্ড ঘটায়। তারা সাঁড়া মাড়োয়ারি হাইস্কুলের প্রবীণ শিক্ষক ওসমান গণির বাড়িসহ বহুসংখ্যক বাড়ি-ঘরে লুটপাট করার পর অগ্নি সংযোগ করে।

ঈশ্বরদী বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ি হাজী আব্দুল বারি ও তার তিন ছেলে গোলাম মাহবুব মিন্টু, গোলাম মোহাম্মদ জান্টু ও গোলাম মওলা ঝন্টুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তারা জহুরুল হক টোনা, কাজি আব্দুল আজিজ, আব্দুল করিম খলিফা, আবু বক্কার, নুর মোহাম্মদ ও ডাঃ নওশের আলীসহ সামনে যাকে পায় তাকেই হত্যা করে বা আহত করে ফেলে রাখে। ঈশ্বরদী থানার জামাতে ইসলামের নেতা খোদা বক্স খান, মুসলিম লীগের বিহারি নেতা ও ঈশ্বরদী কলেজের প্রফেসর নাসিম খান, দাশুড়িয়া এলাকার শাহজাহান এবং আমির মোল্লা নামক রিফিউজি তাদেরকে পুর্ণ সহযোগিতা করে। প্রাণ বাঁচানোর জন্য কিছু সংখ্যক ব্যক্তি একটি মসজিদের ভিতরে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু সেখান থেকে আব্দুল মোতালেব খান, মোয়াজ্জেম হোসেন, ব্যবসায়ি রফিক পাটোয়ারি ও হেলালসহ বেশ কয়েকজনকে নৃসংশভাবে হত্যা করে। স্থানীয় জামায়াত নেতা ও বিহারিরা আকতার হোসেন খোকন নামক এক যুবককে পাকিস্তানি আর্মিদের হাতে তুলে দেয়।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত গোটা পাবনা শহর শত্রুমুক্ত থাকে। ১১ এপ্রিল তারিখে তারা পাবনা ও ঈশ্বরদী শহরে প্রবেশ করে। এই খবর পাবার পর ঈশ্বরদীর বাঙালি জনসাধারণ তাদের ঘর-বাড়ি ফেলে অন্য এলাকায় পালিয়ে যায়। সমগ্র এলাকা বাঙালি শুন্য হয়ে পড়ে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল শাখার বিভাগীয় শহর পাকশীতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে। পাকশী এলাকার প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যগণ ক্ষিপ্ত হয়ে সেখানে চাকুরিরত এবং বসবাসরত অবাঙালি বিহারিদের মধ্য হতে প্রায় ৫শ জনকে একটি মাঠে জড়ো করে গুলি করে হত্যা করে লাশগুলো পদ্মা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এ ঘটনার পর পরই সন্ধ্যা নাগাদ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গোটা পাকশী এলাকা দখল করে শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে। ঐতিহ্যবাহি রেল সেতু পাকশী হাডিঞ্জ ব্রিজ এর উভয় পাশে প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে ইপিআর এর হাবিলদার আব্দুর রউফ এর নেতৃত্বে ৩০ জন ইপিআর ও কিছু সংখ্যক পুলিশ মুক্তিকামি স্বেচ্ছাসেবিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে।

একাধারে সাত দিন পাকিস্তানি বাহিনীকে পদ্মা নদী পার হতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখে। শত্রু বাহিনীর কাছে ছিলো অত্যাধুনিক ভারি মরণাস্ত্র। অন্য দিকে প্রতিরোধ বাহিনীর নিকট শুধুমাত্র ৩০৩ রাইফেল, বন্দুক ও সীমিত সংখ্যক গোলা-বারুদ। স্বভাবতই শত্রু বাহিনীর আক্রমণের মুখে প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যরা তাদের এ্যাম্বুশ গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয় এবং প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের দিকে পাড়ি জমায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঈশ্বরদী ও পাকশীতে শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পিস কমিটির নেতাদের সহযোগীতায় ১৪ এপ্রিল ঈশ্বরদী সংলগ্ন (ঈশ্বরদী গোপালপুর রেল লাইনের পুর্ব পাশে) হিন্দু অধ্যুষিত কচুয়া গ্রামে পাকিস্তানি আর্মি ও সশস্ত্র বিহারিরা এক যোগে হামলা চালিয়ে গ্রামটি তছনছ করে ফেলে। এদিন সকালে দিকে দুটি জিপে করে ১০/১২ জন পাকিস্তানি সেনা তাদের বেশ কিছু সহযোগি বিহারি গুলি বর্ষণ করতে করতে এই গ্রামে প্রবেশ করে। বিহারিদের হাতে ছিলো খোলা তলোয়ার, রাম দা ও বড় বড় ছোরা। গুলির শব্দে ও পাকিস্তানি হায়েনাদের ভয়ে গ্রামের লোকজন যে যেভাবে পারে জীবন রক্ষার তাগিদে বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশের আখের ক্ষেতের মধ্যে লুকাতে থাকে। পাকিস্তানি সেনারা পলায়নপর গ্রামবাসির ওপর গলি বর্ষণ করলে বহুসংখ্যক মানুষ হতাহত হয়। তারা ঘরে ঢুকে সোনা-দানাসহ মুল্যবান জিনিষপত্র লুট করে নিয়ে যায়। সেই সাথে কয়েকজন যুবতিকেও তারা জোর পুর্বক ধরে নিয়ে যায়।
১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল বিকাল বেলা ঈশ্বরদী থেকে একটি জিপ ও একটি পিকাপ নিয়ে ৮/১০ জনের একটি পাকিস্তানি আর্মির দল সশস্ত্র একদল বিহারিকে সঙ্গে নিয়ে আড়মবাড়িয়া বাজারে গিয়ে লুট-পাট চালায়। তারা বড় বড় দোকানের ক্যাশ বাক্স ভেঙে টাকা-পয়সা ও মুল্যবান জিনিষপত্র নিয়ে যায়। এই দলের নেতৃত্বে ছিলো তৎকালিন ঈশ্বরদী জিন্নাহ কলেজের বাণিজ্য বিভাগের প্রভাষক বিহারি নাছিম খান।(নাছিম প্রফেসর নামে পরিচিত।)

১৯ এপ্রিল ঈশ্বরদী শহর সংলগ্ন পিয়ারাখালি গ্রামে তারা নারকিয় তান্ডব চালায়। এদিন সকালের দিকে বেশ কিছু পাকিস্তানি সৈন্য বিহারিদের একটি সশস্ত্র দলকে সাথে নিয়ে এই গ্রামে ঢুকে ব্যাপক লুট-তরাজ করে। কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ডাঃ রফিককে গুলি করে হত্যা করে। তারা কয়েকজন যুবতি মেয়েতে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে কয়েকটি গরু-ছাগলও নিয়ে যায়।
২৩ এপ্রিল তারিখে তারা একই কায়দায় বাঘইল গ্রামে আক্রমণ চালায়। তারা পাশবিক কায়দায় নারী ও তিন মাসের শিশুসহ ১৯ জন গ্রামবাসিকে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়। ২৫ এপ্রিল পাকশী কাগজ কলের অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প হতে পাকিস্তানি সৈন্য ও বিহারিরা দু দলে বিভক্ত হয়ে সাহাপুর ও লক্ষিকুন্ডা ইউনিয়নের দিকে রওনা দেয়। পথিমধ্যে যেসকল গ্রাম তাদের সামনে পড়ে সেই সকল গ্রামে অবাধে লুট-তরাজ করে। ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং গণহত্যা চালায়। কিছুসংখ্যক মহিলার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।

দাদাপুর হাট নামক স্থানে লাইনে দাঁড় করিয়ে তারা ৪০/৫০ জন নারী-পুরুষকে নির্বিচারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। রূপপুর গ্রামের ১৫/১৬ জন গ্রামবাসিকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। তারা পাকুড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করে ১২/১৩ জন গ্রামবাসিকে গুলি করে হত্যা করে। এই গ্রামের বাসিন্দা পাকুড়িয়া হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক ওমেদ আলী মুন্সিকেও একই সঙ্গে হত্যা করে। পাকিস্তানি হায়না ও স্থানীয় পিস কমিটির নেতা এবং বিহারিরা এক জোট হয়ে এই সকল অপকর্মে লিপ্ত হয়। তারা সাহাপুর মহাদেবপুর গ্রামেও নারকিয় তান্ডব চালায়। (চলবে)। (লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।