মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের দিন গুলো

প্রকাশকাল- ২০:২৬,ডিসেম্বর ৪, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

 এবাদত আলী (৬)
(পুর্ব প্রকাশের পর)।

পাবনার তৎকালিন জেলা প্রশাসক মোঃ মাহবুবুর রহমানের উদ্যোগে পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের জন্য সাংবাদিক ও কলামিস্ট রনেশ মৈত্রকে সঙ্গে নিয়ে ডিসি পুলের একটি জিপে করে পাবনা সদর থানার দাপুনিয়া ইউনিয়নের মাধপুর গিয়ে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ এই মাধপুরে যে ভয়াবহ প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো তার তথ্য সংগ্রহ শেষে আমরা ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ লুৎফর রহমানের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পথে যেতে মাধপুর গ্রামেই আরেকটি ঘটনার বিষয় সম্পর্কে অবগত হবার জন্য আমরা আবুল ডাক্তারের বাড়ির পাশে হাজির হলাম। এই গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে পাবনার মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল ভারত থেকে অস্ত্র-শস্ত্র ও গোলা-বারুদ নিয়ে পাবনায় প্রবেশের সময় আবুল ডাক্তারের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর সেই খবর রাজাকারদের মাধ্যমে অবগত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমণ করে। এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বকুলের নিজের কথায় আসা যাক। ১৯৯৫ সালের ২৭ মে তারিখে তাঁর বাসায় বসে তার যে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম সেদিন তিনি যা বলেছিলেন, তার ভাষায় তা নি¤েœ তুলে ধরা হলো। রফিকুল ইসলাম বকুল বলেছিলেন, “ তখন রমজান মাস। একটা বড় ধরনের অপারেশনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সে মোতাবেক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অতিরিক্ত অস্ত্র পাঠানো প্রয়োজন। এবারে আমি, ইসরাইল হোসেন মেছের ও হাশেমসহ একটি বড় দল নিয়ে তালবাড়িয়া ডিগ্রির চর পার হয়ে প্রথমে জফির ডালিকির বাড়িতে উঠি এবং সেখান থেকে মাধপুরের আবুল ডাক্তারের বাড়িতে যাই।
অস্ত্র-শস্ত্র বোঝাই বাক্সগুলো যথারীতি গর্ত খুঁড়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। অজ পাড়া গাঁয়ে কোনভাবেই মিলিটারিদের আসার কথা নয়, তাই সম্পুর্ণ নিরাপদ স্থান ভেেেব আমরা রাতের বেলা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ি। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসা মুক্তিযোদ্ধাগণ গভীর ঘুমে অচেতন। এই সুযোগে রাজাকারদের মাধ্যমে খবর পেয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভোর বেলা অতর্কিতে আমাদের উপর আক্রমণ করে বসে। এইচ এমজির ফায়ারে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আত্মরক্ষামুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। আমাদের কাছে যে অস্ত্র-শস্ত্র ছিলো এবং আমাদের সংখ্যা যা ছিলো তাতে বিনা চ্যালেঞ্জে তাদেরকে ছেড়ে দিতামনা কিন্তু আমরা ছিলাম সম্পুর্ন অপ্রস্তুত এবং আমাদের প্রায় সকল অস্ত্র ও গোলা-বারুদ ছিলো মাটির নিচে। তাই বাধ্য হয়ে আমরা দুরে সরে যাই। এদিকে পাকিস্তানি আর্মিরা গুলি ছোঁড়ার পাশাপাশি বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে দিতে লাগলো। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলে প্রাণ ভয়ে গ্রাম ছেড়ে যে যেদিকে পারে পালাতে থাকে। তারা প্রায় ১১-১২ জন গ্রামবাসিকে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়।”
এখানে প্রত্যক্ষদর্শিরা আরো নানাভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশিয় দোসর পিসকমিটির সদস্য ও নকশাল বাহিনীর তান্ডবের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শির বিবরণ ছিলো এই রকম ঃ- “ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কালাম আজাদ বাবু ও সাইদ আক্তার হোসেন ডিডুর কারণে ডাঃ আবুল হোসেনের বাড়িটি মুক্তি বাহিনীর অস্থায়ি ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় পরিকল্পনা বলতে গেলে এ বাড়ি থেকেই করা হতো। সেকারণে এই বাড়ির লোকদের প্রতি শত্রুপক্ষ ছিলো দারুন নাখোশ। ফলশ্রুতি হিসেবে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর নকশাল বাহিনী বার বার এই বাড়িতে হানা দিয়েছে। তারা আবুল ডাক্তারের ভাই মকবুল হোসেনকে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে হত্যা করে।
সেদিন ছিলো ১৯৭১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। বর্ষার পানিতে নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। ২৯ মার্চ জন্মগ্রহণ করা বড় নাতি বুলেটের ভীষণ অসুখ। স্থানীয় ডাক্তারের চিকিৎসায় অসুখ না কমায় তাকে পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তির জন্য মকবুল হোসেন ও তার স্ত্রী নাতি ছেলেকে নিয়ে নৌকাযোগে পাবনা শহরাভিমুখে রওনা হন। তারা টিকরি গ্রামের নিকট পৌঁছামাত্র কুলে নৌকা ভিড়ানোর আদেশ দেয় নকশাল বাহিনী। নৌকা ভিড়ানো হলে মকবুল হেসেনকে তারা নামিয়ে রাখে। তার স্ত্রী নানাভাবে আকুতি জানালেও তাদের পাষাণ মন কোন মতেই গলেনা। ডাঃ আবুল হোসেন ছোট ভাইকে ফিরে পাবার জন্য যা যা করার তাই করলেন, কিন্তু তাতে কোন কাজ হলোনা। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে কয়েকদিন পর খবর আসে যে, মকবুল হোসেনের খন্ডিত মাথা বাঙড় নদীতে ভেসে উঠেছে। মকবুল হোসেনের সঙ্গে আওতাপাড়া গ্রাম প্রধান হারেজ উদ্দিনকেও তারা সেদিন হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে মাধপুর গ্রামের নাজিম উদ্দিন সরদার তাদের হাত থেকে ছাড়া পান।”
এরপর আমরা এবার ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ লুৎফর রহমানের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হলাম
মুক্তিযুদ্ধের সুচনালগ্নে ইশ্বরদী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে ঈশ্বরদীতে যে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছিলো, মোঃ লুৎফর রহমান ছিলেন সেই কমিটির অন্যতম সদস্য। আমরা যখন তার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম দেখি তিনি অসুস্থ। রনেশ মৈত্রের অতি ঘনিষ্টজন হওয়ায় তিনি তার বড় ছেলে এলিনুর রহমান এলিনকে আমাদের সঙ্গে পাঠালেন। আর একথাও বল্লেন আমরা যেন তার বাড়িতে এসে দুপুরের খাবার তার সঙ্গে খাই।
এলিন আমাদেরকে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরসহ বিভিন্ন স্পট দেখাতে নিয়ে গেলেন। পাবনা- পাকশি বগামিয়া সড়কের পাশেই শহীদ ওহিদুর রহমান ওহিদের কবর। আমরা সেখানে গেলে বহু লোকজন জড়ো হয়। রাস্তার পাশেই আব্দুল মান্নান সরদারের দোকান। তিনি ওহিদের পরিবার সম্পর্কে আমাদেরকে বিভিন্ন তথ্য দিলেন। ওহিদুর রহমান ওহিদ বোমা বহন করে মাধপুরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অতি সাহসি এই যুবক অনেক গুলো বোমা নিজের শরীরে লুকিয়ে সেই বটগাছের একটি ডালের উপর বসে ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন সেই বটগাছের নিচ দিয়ে যাচ্ছিলো তখন তিনি তাদের গাড়ির উপর বোমা নিক্ষেপ করে। ফলে তাদের গোলা-বারুদের গাড়িতে আগুন ধরে যায়। কিন্তু বোমার ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে তিনি বটগাছ থেকে নিচে পড়ে যান। তার শরীরে থাকা বোমাগুলো সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হলে তিনি শাহাদত বরণ করেন।
একই যুদ্ধে শহীদ ঈশ্বরদী জিন্নাহ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি হাবিবুর রহমান রাজুর কবরটি সাহাপুর গোরস্থানে। আমি উপস্থিত লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে কবর জিয়ারত করলাম। (চলবে)।
(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।