মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের দিন গুলো (৫)

প্রকাশকাল- ১৮:৫৪,নভেম্বর ২৬, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

এবাদত আলী
(পুর্ব প্রকাশের পর)।
পাবনার তৎকালিন জেলা প্রশাসক মোঃ মাহবুবুর রহমানের উদ্যোগে পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের জন্য সাংবাদিক ও কলামিস্ট রনেশ মৈত্রকে সঙ্গে নিয়ে ডিসি পুলের একটি জিপে করে পাবনা সদর থানার দাপুনিয়া ইউনিয়নের মাধপুর গিয়ে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ এই মাধপুরে যে ভয়াবহ প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো তার তথ্য সংগ্রহ শেষ করতে গিয়েও শেষ হয়না। এর সাথে ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ১১ এপ্রিলের আগে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঈশ্বরদীতে প্রবেশ করার পুর্বে ঈশ্বরদীর নেতা-কর্মিরা অর্থাৎ সেচ্ছাসেবি যোদ্ধাগণ ঈশ্বরদী বমিান বন্দর পাহারা দিয়ে রাখে। ঈশ্বরদী বিমান বন্দরে সেসময় কোন বিমান ছিলোনা। বিমান চালকসহ সকল ষ্টাফ আগেভাগেই ঢাকায় চলে যায়। মুক্তিকামি যোদ্ধাগণ রানওয়ে ধ্বংসের জন্য চেষ্টা চালায়।
তারা শক্তিশালি ডিনামাইট তৈরি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ফলে কম শক্তিশালি ডিনামাইট দিয়ে বিমান বন্দরের রানওয়ে ধংস করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিমান বন্দরের মজবুত রানওয়ে কিছুতেই ধ্বংস করা সম্ভব হয়না। তবে বিমান বন্দরটি চারদিক থেকে ঘেরাও করে রাখা হয়েছিলো। এদিকে জনৈক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনসহ ১৩ জন সৈন্য, কিছু পুলিশ ও আনসার সদস্য মার্চ মাস থেকেই বিমান বন্দরটির পাহারায় নিয়োজিত ছিলো। তারা যে সেচ্ছাসেবিদের বেষ্টনির মধ্যে দিন যাপন করছিলো তাও তারা জানতো। কিন্তু তাদের পালাবার সকল পথ স্বেচ্ছাসেবিরা বন্ধ করে রেখেছিলো। ১ এপ্রিল তারিখে তাদের সকলকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়। আটক কৃত ৬ জন পাঞ্জাবি সৈন্যকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ সংলগ্ন পদ্মার তীরে নিয়ে হত্যা করা হয়। বাকিদের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো তথ্য দাতাগণ সে ব্যাপারে ওয়াকিহাল নন বলে জানান। তারা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা তুলে ধরলেন, যিনি আমার পুর্ব পরিচিত।
ঈশ্বরদী থানার দাদপুর গ্রামের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হক। যিনি রাজশাহীর একটি যুদ্ধে শহীদ হন। তোজাম্মেল হক আমার সহপাঠি। আমরা পাবনা শহরের রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে (আর এম একাডেমি) ১৯৬১ সাল হতে একসঙ্গে লেখাপাড়া করতাম। ক্লাস নাইনে ওঠার পর ও সাইন্স গ্রুপে আর আমি আর্টস গ্রুপে পড়া লেখা করতাম। সেবারই আর এম একাডেমি হতে সর্বপ্রথম বার্ষিকি প্রকাশের প্রস্তুতি চলে। প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক সহকারি শিক্ষক জহুরুল হককে এবং আমাকে (মোঃ এবাদত আলীকে) বার্ষিকি সম্পাদনার যৌথ দায়িত্ব দিলেন।বার্ষিকি সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসেবে বন্ধু  তোজাম্মেল হককে আমার পাশেই রাখলাম। আসলে বাল্যকালে প্রতিভাধর ও সুদর্শন বন্ধুকে কেউই কাছ ছাড়া করতে চায়না।বার্ষিকিতে ওর একটি কবিতা ছাপা হয়েছিলো। কবিতার নাম ছিলো ‘ জাগরণী’ যার শুরুটা ছিলো এভাবে:“ রন হুংকারে কাঁপে থর থর – পবিত্র জন্মভুমি।”
১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হতে ভারত পাকিস্তানের যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মাতৃভূমির প্রতি তার মমত্ববোধ ফুটে উঠেছিলো তার কবিতায়। ১৯৬৬-৬৭ সালে আর,এম, একাডেমী হতে প্রকাশিত বার্ষিকির কবিতা এবং বার্ষিকি সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসাবে আমার পাশে বন্ধু তোজাম্মেল হকের হাস্যোজ্জল সেই ছবি আজো আছে। যা দেখে মাঝে মধ্যেই আমি সেই সোনালী অতীতে হারিয়ে যাই। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ তোজাম্মেল হকের কথা মনে হলেই আমি কেমন যেন হয়ে যাই।
আসলে স্বজন কিংবা বন্ধুজন হারানোর ব্যথা মানুষ সহজে ভুলতে পারে না; ভোলা যায় না। ১৯৬৮ সালে আমরা এইচ,এস,সি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হলাম। তোজাম্মেল চলে গেল রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, আর আমি এডওয়ার্ড কলেজেই রয়ে গেলাম।
১৯৬৯ সালের গন অভ্যুত্থান এবং ৭১ এর অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন সময় পর্যন্ত ও তোজাম্মেল হকের সাথে যোগাযোগ ছিল। মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরকে অংশ নিতে হতে পারে এমন কথাবার্তাও হয়েছিলো মার্চের উত্তাল আন্দোলনের সময়। ১১ এপ্রিল ‘৭১ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্বিতীয়বারের মত নগরবাড়ি ঘাট হয়ে পাবনায়  প্রবেশ করে। স্থানীয় দালালদের সহায়তায় তারা গনহত্যা, লুটপাট ও অগ্নি সংযোগ চালাতে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষনের জন্য আমরা ভারতে চলে যাই। এরপর তোজাম্মেল হকের সাথে আর সাক্ষাৎ হয়নি। স্বাধীনতা লাভের পর জানতে পারলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা সূর্য উদিত হবার মাত্র ৪ দিন আগে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সম্মুখ লড়াইয়ে তোজাম্মেল হক শহীদ হয়েছে। তার সহযোদ্ধা রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্র শহিদুল হক ভুলু তোজাম্মেল হক সম্পর্কে বলেছেন,“ তারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজশাহীতে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করে। কানসাটের যুদ্ধেও তারা অংশগ্রহণ করেছিলো। পরে ১২ ডিসেম্বর রাজশাহীতে পাকিস্তানি হানাদর বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে তিনি শহীদ হন। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চত্বরে বর্তমান বি,আই,টি’র প্রধান ফটকের পশ্চিম পাশে তার কবর রয়েছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হককে নিয়ে লেখা লেখি করবো এমন অভিপ্রায় আমার ছিলোনা বল্লেই চলে। বন্ধু হারানোর দহন জ্বালা বুকেই চেপে রেখেছিলাম এতদিন। কিন্তু তার ভাতিজা ইঞ্জিনিয়ার এমদাদুল হক রঞ্জু একদিন এসে আমার সঙ্গে পরিচয় করে জানালো যে তার চাচার নাম শহীদ মুকিআতযোদ্ধা তোজাম্মেল হক। মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত তালিকা বা গেজেটে আজো অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আমার সহপাঠি বন্ধু ও সহযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত না হওয়ায় এবং তোজাম্মেল হকের পরিবারকে শহীদ পরিবার হিসাবে ঘোষণা না করায় আমি দারুনভাবে ব্যথিত হলাম।
রঞ্জুর অনুরোধে আমরা সেদিন ১৭ এপ্রিল ২০০০খিষ্টাব্দের সকালে পাবনা ৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কে,এম, আনোয়ারুল হক, দৈনিক চাঁদনী বাজার পাবনা ব্যুরো পরিচালক এইচ,কে,এম, আবু বকর সিদ্দিক, ভাতিজা রঞ্জু সহ উক্ত সংসদ সদস্যের জিপে করে রাজশাহী রওনা হলাম। সাবেক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। বর্তমানে বাংলাদেশ ইনিষ্টিটিউট অব টেকনোলজি (বি,আই,টি) রাজশাহীতে পৌছলাম। বি,আই,টির গেট দিয়ে ঢুকতেই বাম পাশে চোখে পড়লো শহীদ তোজাম্মেল হকের সমাধিস্থল। একই বেষ্টনীতে তিনটি কবর। চারদিকে উলু খড়। কবরের বেষ্টনির মাঝে ঘন ঝোপ জঙ্গল লতা পাতায় যেন জড়াজড়ি করে রয়েছে। কোন সময় কেউ হয়তো ভুলেও কবরের পাশে গিয়ে দাড়াবার তেমন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি বলেই মনে হলো।
ভাঙ্গা চোরা খাল বাকলা ওঠা বেষ্টনীর গায়ে মাঝখানে খোদাই করে লেখা রয়েছে শহীদ তোজাম্মেল হক, পিতা: ময়েন উদ্দিন, দাদপুর, পাবনা। শহীদ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সন। একপাশে রয়েছে শহীদ আবু জাফর শওকত রেজা, পিতা: আব্দুল হামিদ, দরগাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনা। জন্ম ১৯৪৮ সন। শহীদ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সন। অপরজন শহীদ আমিনুর রহমান, পিতা: হাবিবুর রহমান, দামুদ্যা, ফরিদপুর। শহীদ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সন।
তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবরে বেড়ে উঠেছে বেশ কিছু গাছ পালা। বড় একটি শিমুল গাছ শির উচু করে দাড়িয়ে আছে। গাছ থেকে সদ্য ফোটা তুলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কবর সহ আশে পাশে।
আমরা কবর জিয়ারত শেষে বিআইটির পরিচালকের সাথে সাক্ষাতের জন্য গেলাম। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় মহাবিদ্যায় গুলোতে যেমন ছাত্র নেতৃত্বে টানা পোড়েন, ভেবেছিলাম বিআইটি তার ব্যতিক্রম হবে। কিন্তু এখানকার পরিবেশও ছাত্র রাজনীতি মুক্ত নয়। পরিচালকের কক্ষে তখন এক গাদা ছাত্রের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলছিলো।
এক সময় ঝঞ্ঝাট মুক্ত হলে আমরা পরিচালক প্রফেসর জি,এম, হাবিবুল্লার সাথে সাক্ষাৎ করে শহীদ তোজাম্মেল হক সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি সাথে সাথে ফোনের রিসিভার তুলে ফোন করলেন রেজিস্টারের কাছে। রেজিস্টার এলেন। আলাপ পরিচয় পর্ব সমাধা অন্তে রেজিস্টার আমানুল ইসলাম অতি আগ্রহ ভরে ফোনে সহকারি রেজিস্টারের সাথে কথা বলেন। সহকারি রেজিস্টার (শিক্ষা) হাবিব উদ্দিন আহমদ এসে তোজাম্মেল হকের কথা শুনে আবেগ আপুত কন্ঠে বলেন তোজাম্মেলকে আমি চিনতাম; আমার দপ্তরে তার সকল বৃত্তান্ত রয়েছে। আমরা তার দপ্তরে গেলাম। খুজা-খুজি শুরু হলো। অনেক্ষণ ধরে খুজা-খুজির পর প্রায় ৩০ বছর আগের রেজিষ্টার খানা পাওয়া গেল। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হকের সকল বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ রয়েছে তাতে।
নিয়ম মাফিক আবেদনের প্রেক্ষিতে সহকারি রেজিস্টার ও রেজিস্টারের সহযোগীতায় বিআইটির রাজশাহীর পরিচালকের নিকট হতে শহীদ তোজাম্মেল হকের অনুকুলে একখানা প্রত্যয়ন পত্র পাওয়া গেল। এই প্রত্যয়ন পত্র বলেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তোজাম্মেল হকের নাম মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের তালিকা ভুক্ত এবং মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের গেজেটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত  হবে এবং তার পরিবারও পাবেন শহীদ পরিবারের মর্যাদা। পাশাপাশি বিআইটি রাজশাহী ক্যাম্পাসে অবস্থিত শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হক সহ অন্যান্য শহীদদের কবরের সংস্কার করা হলে শহীদদের পুর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। (চলবে) । (লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।