শ্রাবণের অঝোর ধারায় কবি গুরুর মহাপ্রয়াণ

প্রকাশকাল- ১৯:৩৪,আগস্ট ১১, ২০১৭,মুক্ত চিন্তা বিভাগে

আশুতোষ সাহা

শ্রাবণ মাস কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের। মাসান্তেই তাঁর সোনারতরী দেহ অতল সাগরে মণি-কাঞ্চনসহ নিমজ্জিত হয়েছিল। শ্রাবণ মাসের শেষের দিকেই কবির জীবন প্রদীপ নিষপ্রভ হয়। ঐ মাসের তখন বেলাও ছিল শেষ, আপন গৃহে প্রত্যাবর্তনেরও ছিল পালা। মর্ত জীবনের লীলা সাঙ্গ করে, অমর্ত জীবনের পথে পা দেন কবি। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে, শান্তি নিকেতনে কোথাও পাওয়া যাবে না ¯ূ’ল দেহে কবিকে। কিন্তু তাঁর অমর সৃষ্টি, সাহিত্যের প্রতি পরতে পরতে, কবিতার চরণে, নাটকের সংলাপে, সঙ্গীতের কলিতে, উপন্যাসের প্রেম- বিরহের মাঝখানে,চিন্তাশীলের মেধা-মননে, শিল্পীর ভাব আবেগে, আরো কত খানে যে তাঁর কিনারা নেই। আঠারো’শ একষট্টি থেকে উনিশ’শ একচল্লিশ, আশি বছরের সকল সৃজনশীল কর্ম যেন সমস্ত দিগন্তকে ব্যাপিয়া গিয়েছে। এতো অসাধারণ প্রতিভার স্ফুরণ সাধারণে অসম্ভব। তাই তিনি অসাধারণ অনন্তের অংশীদার। নয়তো এতো বিপুল সম্ভার, অনন্ত ঐশ্বর্য কার মধ্যে আশ্রয় নিত? তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল হৃদয়দ্বার উন্মোচিত করে দিয়ে, জগত জীবনের সৃষ্টির রহস্য, সৃষ্টির অপার আনন্দকে কাছে টানতে। কবির পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর ছিলেন নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক। ব্রহ্ম অর্থ বৃহৎ, অসীম অনন্ত। সে অসীম চিন্তকের কোলেই এসেছিল পুত্র রূপে রবীন্দ্রনাথ, সোনায় সোহাগায় যোগ হয়ে। এতো বিত্ত-বৈভবের মধ্যেও কবি মন ছিল নিরভিমান, নিরহংকার। এর প্রমাণ হলো দুঃখী-দরিদ্র, সাধারণ মানুষ, দেশ, মাটি, প্রকৃতি এসব বিষয়ে সকল লিখার বহমানতা। কবির ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতায় দরিদ্রের কুঠির পুড়িয়ে রাণীর শীত নিবারণের যে চিত্র ফুটে ওঠেছে, তাতেই দরিদ্রের প্রতি কবির যে সহানুভতিশীল দৃষ্টি, তা শতরূপে ফুটে ওঠে।বঙ্গদেশে নিজ জমিদারী দেখাশুনার সুবাদে কবি একাকার হয়েছিলেন অতি সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তাই স্বচক্ষে দেখেছিলেন বাংলার প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, সে সাথে দুখী মানুষের শুকনো মূখমন্ডল। তাঁর সৃষ্ট শিল্পকর্ম, শৈল্পিক ভাবনায় বাহ্য ও অন্ত:প্রকৃতি যে অচ্ছেদ্য হয়ে গিয়েছিল তা সহজে অনুমেয়। কবির লিখায়, কবিতায়, সঙ্গীঁতের অন্তরালে মহান স্রষ্টার যে নি:শব্দ পদ চারণা, অসীমের সঙ্গে সসীমের মিলনের যে আয়োজন, তাঁর সার্থক আয়োজক তিনি। জগতের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুটো জিনিস সহাবস্থান করে, তাহলো দিন-রাত, সুখ-দঃুখ, নারী-পুরুষ, প্রেম-বিরহ, অমানিশা-পূর্ণিমা, ভাল-মন্দ ইত্যাদি। তাই বাহ্য জগত থাকলে, অন্তর্জগতও আছে। তিনি বাহ্য ও অন্তর্জগতের সেতু স্বরূপ। এ দুটোর মিলন ঘটানোর এমন নিপুণ কারিগর খুব কম দেখা যায় জগতে। এ দুটো একে অন্যের পরিপূরক। যে সকল সৃজক একটিতেই শুধু অবস্থান করেন, তাঁর সৃষ্টিকর্ম শুধু অসম্পূর্ণই থাকে না, নীরসও হয়। জানা যায়, কবির বয়স যখন ছয় বছর, তখন তাঁর পিতৃদেব কবিকে উপনিষদ নামক বেদ এর জ্ঞান কান্ডাংশ বইটি পড়িয়েছিলেন। যাতে রয়েছে বিশ্ব স্রষ্টা পরমেশ্বরের তত্ত্ব, আত্মজ্ঞান সম্পন্ন হওয়ার পথের দিশা। তাই এ তত্ত্বজ্ঞানের আবহ তাঁর সকল রচনায়। অধ্যাত্ম মহাপুরুষ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে গভীর ভাবে জেনে নেয়ার সুযোগ ছিল না বলে পরবর্তীতে অর্থাৎ পরমহংসদেবের দেহান্তরে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “কি অসম্পূর্ণই না রয়ে গেলাম?” বিশ্ব জুড়ে মানবতার বিজয় পতাকা উড়িয়ে, ভারতে ফিরে এলে স্বামী বিবেকানন্দের ভুয়সী প্রশংসা করতে ভুল করেননি কবি। এগুলো মূলত কবির অধ্যাত্ম ভাবনার লালিত বহি:প্রকাশ। কবির সকল লিখাতে থাকে একটা পরবর্তী আকর্ষণ, যে আকর্ষণ পাঠককে পড়ার ঘোরে রাখে। এটাই তাঁর লিখার মহিমা। তাই মহিমান্বিত এ কবি বঙ্গ সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে স্থান করে দিয়ে, বাংলাদেশকে, বাঙালি জাতিকে করেছিলেন উচ্চ শিরের অধিকারী। আর এ উচ্চ শিরের, উর্বর মস্তিস্কের চেতনায় শ্রাবণের ধারার মত রচনা করেছেন অজস্র সাহিত্যকর্ম। শান্তি নিকেতনে, বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবির প্রাণপ্রিয় বিদ্যাপীঠ। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্যকে উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত করণে তাঁর জুড়ি নেই। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান, দর্শন, কৃষি, সমাজ এমন দিক নেই, যে পথে তিনি পদচারণা করেননি। সকল ক্ষেত্রে তাঁর অপূর্ব সৃষ্টিকর্ম যা খুবই অত্যাশ্চর্য। যাকে কোন তুলনার পর্যায়েই ফেলা যায় না। এতোই অদ্ভূত বিষয়। উনিশ’শ তেরো খ্রিস্টাব্দে প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। যে পুরস্কারটি জগৎখ্যাত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট ডিগ্রি প্রদানে মানিত করেন। কবির কাব্যগ্রন্থ, ‘মানসী’, ‘সোনারতরী’, ‘বলাকা’, ‘গীতাঞ্জলি’ ‘পূরবী’ উল্লেখ যোগ্য। উপন্যাস সমূহ ‘চোখের বালি’, ‘নৌকা ডুবি’, ‘গোরা’, ‘যোগাযোগ’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘শেষের কবিতা’ বিখ্যাত। মাত্র তেরো বছর বয়সে লিখেন ‘বনফুল’ কবিতা, ১৭ বছর বয়সে কাব্যগ্রন্থ ‘কবি কাহিনী’, ২২ বছর বয়সে উপন্যাস ‘বৌ ঠাকুরাণীর হাট’, লিখে তাক লাগিয়ে দেন। শিলাইদহ ও পাবনার সাহবাজপুরে এসে এ বঙ্গকে তিনি করেছেন ধন্য। কবির এক ভক্ত এদেশের শ্রী শৈলজারঞ্জন সরকার, নেত্রকোণা দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম কবির জন্ম দিন পালন করেন। আশি বছর বয়সে বঙ্গ সাহিত্যের এ মহীরুহ কবি, বাইশ শ্রাবণ, তেরো’শ আটচল্লিশ বঙ্গাব্দ, ইংরেজি ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগষ্ট, শ্রাবণের অঝোর ধারায় চির শান্তিতে চলে যান অন্তিম শয়ানে। রেখে যান তাঁর অমিয়বাণী, যা বঙ্গ জাতিকে করে বীরত্বে উচ্চ শির। উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ভয় নাই ওরে ভয় নাই/নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। সত্যদ্রষ্টা, ঋষিপ্রাণ, ভানুপুত্র কবি, তোমাকে অজস্র শ্রদ্ধায় সিক্ত করি বারবার।

তারিখ-১১/০৮/২০১৭