সীমাদের কথা

প্রকাশকাল- ২২:২৩,আগস্ট ৫, ২০১৭,অনাবিল সাহিত্য বিভাগে

  রীনা দাস
সিঁথি ভরা লাল টুকটুকে সিঁদুর নিয়ে ও যখন আমার সামনে এসে দাঁড়াল।আমি তখন শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কাজে ব্যস্ত।মৃদুস্বরে সে ডাকল আমায়—“দিদিমণি” এক পলক তাকিয়ে আমার চক্ষু স্থির, এই সেই মেয়ে যে মাত্র দু’ বছর আগে আমার বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ত।এইদু ‘ বছর ওর শরীরেরও পরিবর্তন হয়েছে অনেক। যেন সে এখন সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে। অথচ মাত্র ১৩ বছরের ফুটফুটে কিশোরী সে। কাছে ডেকে বললাম–“কি রে বিয়ে করলেই কেন?” তার দৃঢ় ও স্পষ্ট জবাব সেদিন আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল অনেক কিছুই। বলল–“কতদিন আর মামাদের হাতে মার খেতাম।” আমি বললাম –“ভালো আছিস এখন?” ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।বললাম–“বড় কি করে তোর?” ছোট্ট করে বলল–“রাজমিস্ত্রির জোগানদার দিদি” বলেই আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল–“আসছি দিদি।”আমি কিছু বলার আগে ও চলে গেল। সত্যি সেদিন ওকে দেখে মনে হয়েছিল বেশ কয়েকদিন বৃষ্টির পর মেঘ কেটে যাওয়া নীল আকাশ ; উন্মুক্ত। ওর নাম “সীমা “।পুরো নাম”সীমা হালদার”। সীমার মুখেই শুনেছি ওর যখন মাত্র ৩ বছর বয়স তখন ওর ১৭ বছর বয়সী মা ওর বাবাকে ছেড়ে অন্য কারও সাথে ঘর বাঁধে। সীমার জন্মদাতাও ঘরে নিয়ে আসে সৎ মা। যার কাছে ঠাঁই হয়নি সীমার। অসহায় সীমাকে ওর দিদা নিয়ে আসেন নিজের ছেলেদের সংসারে।যেখানে তিনি নিজেই উদ্বৃত্ত। পাঁচ বছরের সীমা যখন স্কুলে ভর্তি হই ওকে দেখে বুঝেছিলাম পড়াশোনার জন্য নয় ,নেহাতই পেটের দায় মেটাতে “মিড — ডে –মিল “খেতেই ওর নিয়মিত স্কুলে আসা। কখনো কখনো সাথে নিয়ে আসত মামাতো ভাই বা বোনকে। জিজ্ঞেস করলে বলত –“ওর মা কাজে গেছে তো “। একদিন ওকে ডেকে বললাম—” রোজ স্কুলে আসিস তো পড়াশোনাটা একটু মন দিয়ে কর”।ও বলল–“সময় নাই দিদি।আর কেই বা দেখিয়ে দেবে পড়া। বাড়ি ফিরেই তো মামীদের এটো বাসুন মাজা, ঘর মোছা, উঠোন ঝড় থেকে শুরু করে সব কাজ আমাকেই করতে হবে।” কোনোrina9দিন বড় মামী আর কোনোদিন ছোট মামী রাত্রে দুটো রুটি আর আলুসেদ্ধ দেয় খেতে। এহেন সীমা চতুর্থ শ্রেণীর পড়া শেষ করে “সর্বশিক্ষা মিশন পরিচালিত” একটি বিদ্যালয় -এ ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়। বলা বাহুল্য লক্ষ্য একটাই “মিড –ডে–মিল “। সেই বিদ্যালয়ের নতুন কক্ষ নির্মাণ করতে আসা “রতন মন্ডল”নামের এক ২২ বছর বয়সী জোগানদারের সঙ্গে আলাপ হয় সীমার।ক্রমে তা প্রণয়ে পরিণত হয় এবং মাস দুয়েকের মধ্যেই পলায়ন করে বিয়ে। সীমার সেদিনের হাসিমুখ আমাকে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে বন্ধুগণ।যে দেশে ১৮ বছরের নীচে বিয়ে দেওয়া বেআইনি সে দেশে ১৩ বছরের সীমার বিয়ে হয় কেন??আর পিছনে যুক্তি কী দেবেন আপনারা। অনেক বন্ধুই যাঁরা আমার মত ভাবেন বিয়ে নয় আগে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো উচিত , তাঁদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন —যে দেশে হাজার হাজার সীমা একটু ভালো থাকার জন্য, একটু ভালোবাসার দায়ে বিয়েটাকেই মুক্তির সহজ পথ হিসেবে বেছে নেয়,তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে কে? আমার হত দরিদ্র বোনেদের ১৮ বছর পর্যন্ত মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পথ প্রশস্ত করবে কোন আইন???? ভাবার সময় বোধহয় এসেছে বন্ধুগণ.